মুজতাহিদ ফারুকী
মুজতাহিদ ফারুকী ছবি: নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বিশ্বের মুসলমানদের মনে রাখার মতো একটি দিন চলে গেল চলতি মাসে। সেটি নাইন-ইলেভেন বা ১১ সেপ্টেম্বর। ২৫ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুগপৎ বিমান হামলায় তাসের ঘরের মতো মুহূর্তে ধসে পড়ে আমেরিকার গর্বের টুইন টাওয়ার। মৃত্যু হয় প্রায় তিন হাজার মানুষের। এর বাইরে নিহত হয় বিমানের ১৯ জন আরোহী, যারা ছিনতাই করা বিমান নিয়ে টুইন টাওয়ারে হামলা চালিয়েছিল। 

ওই হামলার জন্য মুসলমানদের দায়ী করে আমেরিকা। বলা হয়— সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদার জঙ্গিরা এ হামলা করে। আল-কায়েদা দমনের নামে শুরু করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, যা কার্যত বিশ্বজুড়ে মুসলিম নিধনের প্রকল্পে পরিণত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়ার বুশ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরুর ঘোষণায় ক্রুসেড শুরুর নির্দেশ দেন। পরে শব্দটা পাল্টে ফেললেও লক্ষ্য ছিল অপরিবর্তিত। সন্ত্রাসবিরোধী সেই যুদ্ধে একের পর এক ধ্বংস করা হয় ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, সোমালিয়া, লেবানন। হত্যা করা হয় ওসামা বিন লাদেনসহ ৪৭ লাখের মতো নিরীহ মুসলিমকে। ঘরবাড়ি, দেশ হারিয়ে উদ্বাস্তু হন এক কোটি ৩০ লাখের বেশি মুসলিম। 

মিত্র দেশ পাকিস্তানের ভেতরে বিনা অনুমতিতে বিমান হামলা চালিয়ে একটি কারাগারের ভেতর থেকে বিন লাদেনকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকার বিশেষ বাহিনী। তাকে আরব সাগরে মোতায়েন যুদ্ধজাহাজে নিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। লাশ ফেলে দেয়া হয় সাগরের অথৈ পানিতে। সবচেয়ে বিভীষিকাময় পরিণতি নেমে আসে বিশ্বের মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে। 

মুসলিম মাত্র জঙ্গি, মৌলবাদী এবং সন্ত্রাসী এমন ধারণা তৈরি করা হয় গোটা পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং অন্য সবখানে। আমেরিকায় ঢুকতে গেলে মুসলিমদের তো বটেই এমনকি মুসলিম বলে সন্দেহ করা যায় এমন অমুসলিমদেরও নির্বিচারে হয়রানি করা হতে থাকে। শুধু আমেরিকায় নয়, অন্য সবখানে এর প্রভাব পড়ে। অনেকসময় মুসলিম হওয়ার অপরাধে বৈধ যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। রাস্তাঘাটে, মার্কেটে, অফিস-আদালতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমদের নানাভাবে অসম্মান করা হতে থাকে। কখনো বিমানবন্দর থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কখনো বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হয়রানি করা হয়। দক্ষিণ ভারতের বিশিষ্ট অভিনেতা কমল হাসানও হয়রানির শিকার হন। কারণ ধর্মে হিন্দু হলেও তার নামের হাসান অংশটি মুসলমানের নামের মতো।

এটি ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রবক্তা বলে কথিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশে মানবতার অবমাননার এক নির্মম ও লাগামহীন ঘৃণার যুদ্ধ। পদে পদে বিশ্ববাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হতে থাকে— দেখো, মুসলমানরা কত জঘন্য, বর্বর, বিবেকহীন; কী ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী এবং জঙ্গি এরা! এরা সভ্যতার শত্রু, মানবজাতির শত্রু। 

পাশ্চিমা মিডিয়া— সংবাদমাধ্যম, সংবাদপত্র, সাময়িকী, রেডিও, টিভি সমাজিক সব মাধ্যমে একযোগে অবিরাম চলতে থাকে সুসংগঠিত এই ইসলামোফোবিক প্রোপাগান্ডা। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, একপর্যায়ে অনেক মুসলিম তরুণ-তরুণী, এমনকি বয়স্কদের কেউ কেউ বলতে শুরু করেন, মুসলমান হিসেবে অর্থাৎ মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়ায় তারা লজ্জিত। অনেকে সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। 

আজকের তরুণ-তরুণীরা চিন্তাও করতে পারবে না সারা দুনিয়ার মুসলমানদের জীবন কতটা দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির কথা ধরা আছে কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে, লেখা আছে কিছু উপন্যাসে, কাহিনীতে। আজকের দিনে কেউ সেই বিভীষিকার দিনগুলো উপলব্ধি করতে চাইলে এসব সাহিত্যকর্ম বা শিল্পকর্ম দেখতে বা পড়তে পারেন। এগুলো শুধু সেই অসহ্য ভোগান্তির দলিল নয়, ওই পরিস্থিতি উত্তরণে পেনিসিলিনের কাজও করেছে।
 
পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষ প্রশমিত করতে এবং মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য, ভুল ধারণা এবং অমূলক ভীতি দূর করে তাদের সাধারণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে গল্প উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে। কিছু চলচ্চিত্র ও উপন্যাসের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। মূলত ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে এগুলো। সামান্য কিছু অন্য কোথাও। দুর্ভাগ্য, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ন্যূনতম ভূমিকাও নেই। 
 
সবার আগে সম্ভবত আসবে কয়েকটি বলিউড চলচ্চিত্রের নাম। যেমন— ‘মাই নেম ইজ খান’ (২০১০)। শাহরুখ খান অভিনীত এ ছবি নাইন-ইলেভেনের পর মুসলিমদের ওপর আরোপিত ভুল ধারণার বিরুদ্ধে সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী বার্তা নিয়ে আসে। ছবিতে শাহরুখ খান একজন অ্যাসপারগার সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মুসলিম, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করে শুধু একটি কথাই বলতে চান, ‘মাই নেম ইজ খান অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেরোরিস্ট’। অর্থাৎ নামে মুসলিম হলে কেউ সন্ত্রাসী হয়ে যায় না। 

(অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম হলো অটিজম-সংক্রান্ত এমন এক রোগ, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বুদ্ধিমত্তা ও ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা অনেকসময় একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও বেশি হতে পারে; কিন্তু সমাজে মেলামেশা, যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে তারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন)। 

এরপর বলতে পারি নিউ ইয়র্ক (২০০৯) ছবিটির কথা। কবির খান পরিচালিত এ ছবিতে দেখানো হয়েছে নাইন-ইলেভেনের পর মার্কিন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কিভাবে সাধারণ ও নিরপরাধ মুসলিম তরুণদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। এসব ঘটনা সমাজে মানুষের মধ্যে কিভাবে দূরত্ব সৃষ্টি করছে এবং ঘৃণা ছড়িয়ে দিচ্ছে তার নির্মোহ চিত্র উঠে আসে ছবিটিতে। 

মোহসিন হামিদের উপন্যাস অবলম্বনে মিরা নায়ার বানিয়েছিলেন চলচ্চিত্র ‘ দ্য রিলাক্ট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (২০১২)। একজন সফল পাকিস্তানি পেশাদার তরুণের জীবনের গল্প বলে এ ছবি। নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর কিভাবে নিউ ইয়র্কে সেই তরুণের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি বদলে গেল এবং তাকে জঙ্গি হিসেবে গণ্য করা হতে থাকল— সেই মর্মস্পর্শী কাহিনী এই ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হয়।  

এ ছাড়া পাকিস্তানে শোয়েব মনসুরের পরিচালনায় তৈরি হয় ছবি, ‘খুদা কে লিয়ে’ (২০০৭)। এ ছবিতে দেখানো হয়েছে, এক দিকে ধর্মীয় চরমপন্থার প্রভাব এবং অন্য দিকে নাইন-ইলেভেনের পর পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণ মুসলিমদের হয়রানি ও বর্ণবাদের নির্বিচার শিকার হওয়ার নানা ঘটনা। 

এর বাইরে ‘বাবেল’ (২০০৬) এবং ‘রেন্ডিশন’ (২০০৭)-এর মতো হলিউডের ছবিগুলোও পপ কালচারের চিরাচরিত স্টিরিওটাইপ ভেঙে মুসলিম ও আরবদের প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতাময় সাধারণ অহিংস মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। 

একই কথা প্রযোজ্য উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। মোহসিন হামিদের উপন্যাসের কথা আগেই বলা হয়েছে, যেটির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় চলচ্চিত্র দ্য রিলাক্ট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট। বইটি সম্ভবত ২০০৭ সালে প্রকাশিত। একজন পাকিস্তানি তরুণের জবানিতে লেখা উপন্যাসটি নাইন-ইলেভেনের পরের সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ইসলামোফোবিয়ার পটভূমি খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক এইচ এম নকভি (জন্ম ১৯৭৩) লিখেন উপন্যাস ‘হোম বয়’ (২০০৯)। এটি নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী তিন তরুণ পাকিস্তানি বন্ধুর গল্প, যারা নাইন-ইলেভেনের পর হঠাৎ করেই নিজেদের অচেনা এবং সন্দেহভাজন হিসেবে দেখতে পায়। উপন্যাসটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিল।  
এরপর আসে আরেক মার্কিন ঔপন্যাসিক সামিরা আহমেদের উপন্যাস ‘লাভ, হেট অ্যান্ড আদার ফিল্টার্স’ (২০১৮)। তরুণদের জন্য লেখা এ উপন্যাসে মায়া নামের এক মুসলিম-আমেরিকান কিশোরীর গল্প বলা হয়েছে। একটি সন্ত্রাসী হামলার পর যেভাবে তার ও তার পরিবারের ওপর বর্ণবাদী পীড়ন নেমে আসে, সেটি গল্পের বিষয়বস্তু। বইটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার হয়েছিল। 

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরেক মার্কিন নারী লেখক সাহার মুস্তাফা লিখেন উপন্যাস ‘দ্য বিউটি অব ইয়োর ফেস’ (২০২০)। এটি  একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী ও তার স্কুলের গল্প, যা নাইন-ইলেভেন-উত্তর আমেরিকায় মুসলিমদের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ের ছবি তুলে ধরে। 

একেবারে তরুণ লেখিকা লিসা সাবরিন ২০২২ সালে লিখেন ‘ইউ ট্রুলি অ্যাজিউমড’। নাইন-ইলেভেনের পরের কাহিনী নয়; বরং আজকের দিনেও যখন কোথাও কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটলে পরবর্তী সময়ের মতো মুসলিমদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়, তখন তিন মুসলিম তরুণী কিভাবে ব্লগের মাধ্যমে সত্য তুলে ধরে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, সেটিই লিসার কাহিনীর প্রতিপাদ্য। 

এসব সাহিত্য ও শিল্পকর্মে মূলত তুলে ধরা হয়েছে, দুই-চারজন চরমপন্থীর কৃতকর্মের দায় পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়। বলার চেষ্টা করা হয়েছে, মুসলিমরাও সমাজে ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। 
কিন্তু যে কথাটি বলার মতো সময় হয়তো ঘটনার ২৫ বছর পরও আসেনি, সেটি হলো— মুসলমান নয়; বরং লজ্জিত হওয়া উচিত খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের। শুধু গত এক হাজার বছরের বিশ্বের ইতিহাস খতিয়ে দেখলে যে কেউ ওই দু’টি ধর্মীয় গোষ্ঠীর এমন হাজারও নৃশংস নির্মম কর্মকাণ্ডের নমুনা দেখতে পাবেন, যা গোটা মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ ছিল। 
২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলায় দেশটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং এর তেলসহ সব সম্পদ লুণ্ঠন করে; তাতে প্রমাণ হয়— হামলার অজুহাত ছিল একটি বাহনা, যা ছিল ডাহা মিথ্যা। যে ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কথা বলে হামলা করা হয়, সেটি ইরাকের কাছে ছিল না। মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ারকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা যায়নি। যদি কোনো দিন নিঃসংশয়ে এটিও প্রমাণিত হয় যে, টুইন টাওয়ার মুসলমানরা নয়, অন্য কেউ ধ্বংস করেছে তাহলে সেই নরপিশাচদের বিচার করার ক্ষমতা কার আছে? যে মুসলমানরা এখনো নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করছে পরস্পরের বিরুদ্ধে, তাদের কাছে আশা করা যায়? 

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে ইরাকসহ অন্তত সাতটি মুসলিম দেশ ধ্বংসের পর এবার ২০২৬ সালে একই রকম আরেক অজুহাত তুলে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এ যুদ্ধের বিন্দুমাত্র বৈধতাও নেই। খোদ মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন নেই। কিন্তু দেশটি ধ্বংসের খেলায় নেমেছে ঠাণ্ডামাথায়। শুধু ইরান নয়, নিশানায় আছে তুরস্ক, সৌদি আরব, ইয়েমেনও। এর পরও মুসলিমরা নিশ্চুপ। তাদের আশার জায়গা হয়তো একটিই। যিনি অন্ধকার থেকে সত্য প্রকাশ করেন, অলক্ষ্যে গ্রহপুঞ্জের আবর্তন ঘটান, যিনি সব পরিকল্পনাকারীর সেরা পরিকল্পনাকারী, কেবল তিনি পারেন দানবীয় সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির পতন ঘটাতে। আর সেটি কখন কিভাবে কার উসিলায় ঘটবে, কে বলতে পারে! 

লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mujta42@gmail.com