
চাকচিক্যময় আধুনিক ও টেকসই নগরী কেবল ইট-পাথর, বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার কিংবা মেগা অবকাঠামোর সমষ্টি হতে পারে না। নগরের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার সাধারণ অধিবাসীদের সার্বিক জীবনমান, নিরাপদ চলাচল, বিশুদ্ধ বাতাস, সুপেয় পানি, সবুজ উন্মুক্ত স্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তায়। অথচ বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকা এই মৌলিক শর্তগুলো পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। রাজধানীর প্রতিটি ক্ষেত্রে পদে পদে দুর্ভোগ আর জনভোগান্তি। সড়ক কিংবা বাসা সব জায়গায় প্রাণঘাতী দূষণের উপস্থিতি বিরাজমান। এই শহরে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে না পারলেও উঁচু দালান আর চাকচিক্যের কোনো কমতি নেই।
আজ বিশ্ব শহর দিবস। এ দিবসটির মূল বার্তাই হলো— নগর গড়ে উঠবে মানুষের জন্য, মানুষ নগরের জন্য নয়। নগরবিদরা বলছেন, একটি শহরের সফলতা মাপা উচিত তার ভবনের উচ্চতায় নয়; বরং শিশুরা কতটা নিরাপদে খেলতে পারছে এবং সাধারণ নাগরিকরা কতটা স্বস্তি ও সম্মান নিয়ে বেঁচে আছেন তার ভিত্তিতে। অথচ এই শহরে খোলা বাতাস, সুপেয় পানি, সাশ্রয়ী আবাসন ও সুগম চলাচলের ন্যূনতম নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসঙ্ঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটবে শহরগুলোতে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল নগর। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৬ সালের জাতীয় নগর ফোরামের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের নগর অর্থনীতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬৫ শতাংশ জোগান দেয়। তবে এই বিরাট অর্থনৈতিক অবদানের বিপরীতে ঢাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পরিণত হয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও সঙ্কটে।
সকালে কর্মস্থলে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক তলিয়ে যাওয়া, ক্ষতিকর ও দূষিত বাতাস, সুপেয় পানির অভাব এবং সাশ্রয়ী বাসস্থানের মারাত্মক সঙ্কট আজ তিন কোটি মানুষের নিত্যদিনের নিয়তি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে। অথচ ঢাকাকেন্দ্রিক অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ও সেবার কেন্দ্রীভবন রাজধানীর ওপর এমন এক অসহনীয় চাপ তৈরি করেছে, যা পুরো নগর কাঠামোকে ভেঙে পড়ার মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ চলতি বছরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পরিবেশগত সূচকের ভিত্তিতে ঢাকার বাসযোগ্যতার গত দুই দশকের যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাত্র ২০ বছরে ঢাকার পরিচ্ছন্ন ও বসবাস উপযোগী ভূখণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে এবং অবাসযোগ্য এলাকার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে।
সাময়িকীটির গবেষণা তথ্য অনুসারে, গত দুই দশকে ঢাকায় পরিবেশগত বাসযোগ্য এলাকা ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতক্রমে অবাসযোগ্য এলাকা ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ার-এর ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বার্ষিক গড় পিএম দুই দশমিক পাঁচ ঘনত্বের হিসাবে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত প্রধান শহর। ঢাকায় বার্ষিক গড় পিএম দুই দশমিক ৫ ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম, যা মারাত্মক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্য দিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এ বছরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে কেবল ঢাকা শহরেই ৪০৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হয়েছেন। পথচারীবান্ধব ফুটপাথ দখল, মিশ্র যান চলাচল ও আধুনিক গণপরিবহনের অভাবেই এই প্রাণহানি ঘটছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত। ঢাকা অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে এবং জরুরি সেবাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
এ অবস্থায় বাসযোগ্য শহর গড়তে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকায় বিলুপ্ত হওয়া ২৬টি খাল পুনরুদ্ধার, প্রবহমান খালগুলো দখলমুক্তকরণ এবং সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকার জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে দূর করতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডে ঘাটতি নিরূপণ করে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশগম্য খেলার মাঠ, পার্ক ও সবুজ এলাকা গড়ে তোলা জরুরি। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন, আধুনিক মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক এবং ফুটপাথ দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব সড়ক নির্মাণ করতে হবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কর্মস্থলের কাছাকাছি পরিকল্পিত সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। আর বস্তি উচ্ছেদ নয়; বরং সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসনিক কার্যাবলি ও শিল্পকারখানা ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরে স্থানান্তরিত করে ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে হবে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও পরিবেশ অধিদফতরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক ও শক্তিশালী নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ঢাকার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সবুজ এলাকার পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৮ শতাংশে। এ ছাড়া ঢাকার ঐতিহাসিক ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টিই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং শহরের ৪৮টি এলাকা নিয়মিত তীব্র জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল ইতোমধ্যে বিলুপ্ত বা চরম বাধাগ্রস্ত অবস্থায় পড়েছে। কোনো সুস্থ উন্নয়ন দর্শন নয়; বরং নিছক ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থই ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে আমাদের আবাসন এলাকাগুলো কেবল ঘুমানোর জায়গায় পরিণত হয়েছে; অথচ নগর দর্শনে এসব এলাকা থাকার কথা ছিল একেকটি প্রাণবন্ত সামাজিক কমিউনিটি।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশের মাটি, পানি, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ন নামক বৈপ্লবিক দেশজ মডেল তৈরি করা জরুরি। আমাদের শহরগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, টোকিও কিংবা নিউ ইয়র্ক বানানোর অলীক স্বপ্ন ত্যাগ করার সময় এসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট ও গেটেড কমিউনিটি গড়ে ওঠার কারণে পাড়া-মহল্লার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে। আবাসিক ভবনে পাশাপাশি থেকেও প্রতিবেশীরা একে অপরকে চেনেন না। খেলার মাঠ ও মুক্ত আকাশের অভাবে শিশুদের জীবন আজ গৃহবন্দী ও ডিজিটাল পর্দায় সীমাবদ্ধ। শিশু-কিশোরদের সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ায় নগরজুড়ে কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নিরাপদ খেলার মাঠ ও কমিউনিটি স্পেস তৈরি করা না গেলে এই প্রজন্মকে রক্ষা করা অসম্ভব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








