
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৬(ক) ধারা বাতিলসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। সংগঠনটি বলেছে, প্রস্তাবিত আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সাথে সরকারের পরামর্শমূলক সভায় অংশ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে এনইসির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এক বিবৃতিতে এসব সুপারিশ তুলে ধরেন।
এনইসি মনে করে, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের যুগে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রয়োজন। তবে এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতাসহ জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
সংগঠনটির অন্যতম দাবি, সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচার-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত ২৬(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। তাদের মতে, এ ধারার বিস্তৃত প্রয়োগের সুযোগ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রস্তাবিত আইনের ২৯ ধারায় কোনো কোম্পানির নিবন্ধন স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার বিধান প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এনইসি। সংগঠনটির আশঙ্কা, এ বিধানকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো সরকার অতীতের ফ্যাসিস্ট শাসনামলের মতো গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টা চালাতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিলের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা যেতে পারে বলে সুপারিশ করেছে তারা।
এ ছাড়া ৪১ ধারায় ২৬(ক) ধারা অন্তর্ভুক্ত করার বিধানটিও বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একইসাথে কোনো তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনের প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা সীমিত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে এনইসি। তাদের প্রস্তাব, নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বাইরে সরকারের অন্য কোনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা বা বাহিনীকে এ আইনের অধীনে ক্ষমতা দেয়া সমীচীন হবে না।
মানহানির বিষয়টি সাইবার সুরক্ষা আইনে অন্তর্ভুক্ত না করার পক্ষে মত দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের যুক্তি, মানহানির অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দণ্ডবিধিতে আগে থেকেই বিধান রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। ফলে নতুন আইনে মানহানির ধারা যুক্ত হলে অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়তে পারে।
সাইবার বুলিং-সংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞা আরো সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট করার সুপারিশও করেছে এনইসি, যাতে অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে কাউকে হয়রানি করা না যায়।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষায় আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। প্রথমত, সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার থেকে সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় আইনে সুস্পষ্ট সুরক্ষাবিধান রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে ব্যবস্থা নেয়ার আগে বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এ ছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাইবার অপরাধের বিচারের প্রস্তাবিত বিধান বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছে এনইসি।
বিবৃতিতে সংগঠনটি প্রত্যাশা করেছে, জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ নিয়ে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) ১০ দফা সুপারিশ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার ক্ষমতা সীমিত রাখা: নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বাইরে সরকারের অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীকে এ আইনের অধীনে ক্ষমতা দেয়া যাবে না।
২. তথ্য-উপাত্ত অপসারণে বিচারিক অনুমোদন: কোনো তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. মানহানির ধারা বাদ দেয়া: প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে মানহানিসংক্রান্ত কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ, এ বিষয়ে দণ্ডবিধিতে আগে থেকেই বিধান রয়েছে।
৪. সাইবার বুলিংয়ের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা: সাইবার বুলিং-সংক্রান্ত অপরাধের ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট করতে হবে, যাতে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
৫. ২৬(ক) ধারা বাতিল করা: সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচারসংক্রান্ত প্রস্তাবিত ২৬(ক) ধারা প্রত্যাহার করতে হবে, যাতে এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।
৬. ২৯ ধারার নিবন্ধন বাতিলের বিধান প্রত্যাহার: কোনো কোম্পানির নিবন্ধন স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার বিধান বাদ দিতে হবে। এর পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা যেতে পারে।
৭. ৪১ ধারা থেকে ২৬(ক) বাদ দেয়া: ৪১ ধারায় অন্তর্ভুক্ত ২৬(ক) ধারার বিধান বিলুপ্ত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা: সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার থেকে সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় আইনে সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে।
৯. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিচারিক অনুমোদন: পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে ব্যবস্থা নেয়ার আগে বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
১০. মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচারের বিধান বাতিল: সাইবার অপরাধের বিচার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে করার প্রস্তাবিত বিধান বিলুপ্ত করতে হবে।
এনইসির মূল বক্তব্য হলো সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








