
সামাজিক অবক্ষয়কে অপরাধের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধগুলোর পেছনে মাদক, জুয়া কিংবা পর্নোগ্রাফির মতো অনুষঙ্গ জড়িত।
তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতিটি জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তা দ্রুততম সময়ে উদ্ঘাটন, অপরাধীদের গ্রেফতার ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমরা সকল জঘন্য অপরাধের ঘটনা দ্রুততম সময়ে উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পেরেছি। আর যেগুলো সময়সাপেক্ষ সেগুলো তদন্তের পরে দেখা যাবে যে কতটুকু অগ্রগতি আমরা করতে পেরেছি।’
সম্প্রতি কুমিল্লায় সংঘটিত ১৩ বছর বয়সী কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, নিখোঁজের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহত কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে জড়িত চারজন সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আসামিরা অপরাধ স্বীকার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তরা কিশোর অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত এবং নিহত কিশোরের চেয়ে বয়সে ৫ থেকে ১০ বছরের বড়। তাদের কাছ থেকে নিহত কিশোরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ যাবতীয় আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।’
পুলিশের সময়োপযোগী তৎপরতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘দ্রুততম সময়ে আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন করে চার্জশিট দাখিল করা হবে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো এ ঘটনার বিচারও যেন সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন হয়, সে জন্য বিচার বিভাগকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে।’
সামাজিক অবক্ষয়কে অপরাধের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রায় সব ক্ষেত্রে দেখা যায় সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধগুলোর পেছনে মাদক, জুয়া কিংবা পর্নোগ্রাফির মতো অনুষঙ্গ জড়িত। এ থেকে উত্তরণে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পর্যায় থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে, যাতে আমাদের যুবসমাজ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে বিকশিত হতে পারে।’
এছাড়া সমাজের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাতের আঁধারে ককটেল বিস্ফোরণ ও পার্কিং করা বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার কড়া সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, “নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তথাকথিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এ অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। ককটেলবাজির ঘটনায় মোটরসাইকেলসহ আসামিদের গ্রেফতার করে বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি হাইকোর্ট ফটক ও যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় জড়িতদের ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যান্য ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত করার কাজ চলছে।’
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘জনগণ ও সরকার এসব অপতৎপরতায় মোটেও শঙ্কিত নয় এবং দেশবাসী ইতোমধ্যে এদের বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছে।’
বিরোধী দলের সাম্প্রতিক লংমার্চ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে যেকোনো রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক সমালোচনা ও কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলে বিরোধী দলের লংমার্চগুলো সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে।’
রাজনীতিতে জনমতের মাধ্যমেই সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রধান দায়িত্ব শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে যেকোনো অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে উদাসীনতাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ‘বিগত আমলের পুঞ্জীভূত সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাময়িক সংকট তৈরি হলেও বর্তমান সরকার দেশের নিজস্ব সম্পদ আহরণে মনোযোগ দিয়েছে। দেশের শিল্পখাতে গ্যাসের ধারাবাহিক সরবরাহ বজায় রাখতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে ইতোমধ্যে দৈনিক ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়েছে।’
নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতই গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান মিলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “গত শুক্রবারে তেজগাঁওয়ের একটি মসজিদে নামাজ শেষে গোপন বৈঠকে বসলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২৩ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মোবাইল ফোন ফরেনসিক ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর যাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সেই ১১ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে পাওয়া তথ্যানুসারে তারা ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি নতুন উগ্রবাদী সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।”
যেকোনো ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী জানান, ‘জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে রিমান্ডে আনা হয়েছে এবং আইনানুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’







