
হামিদুল ইসলাম সরকার
দীর্ঘদিন ধরেই জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যায় জর্জরিত খুলনা মহানগরী। জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থেকে খুলনাকে মুক্ত করতে যে প্রকল্প, তারই গতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। সাড়ে পাঁচ বছরে যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল সেটি এখন সাত বছরে উন্নীত হলো। প্রকল্পের মূল মেয়াদ সাড়ে পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন মাত্র ৭০ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি তারও কম। সেখানে বাকি কাজ শেষ করতে হাতে রয়েছে মাত্র দেড় বছর। প্রকল্পের কাজের গতি না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে চোখের পলকে ২৭০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রকল্পটির সংশোধিত রূপরেখা অনুমোদনও দেয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ আরো দেড় বছর পিছিয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত গড়াল।
এবার ব্যয় বাড়ল কত?
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি শুরু হয়। এর মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৩৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবায়নকালে নানা অজুহাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ (খুলনা ওয়াসা) তা সংশোধন করে দুই হাজার ৬০৪ কোটি ৫০ লাখ ৮ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়। এখানে এডিবির ঋণ রয়েছে এক হাজার ৫৫৩ কোটি ২৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
কেন এত ধীরে কাজ?
প্রকল্পের দলিলের তথ্য বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠছে, ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজের গতি কেন এত মন্দা? তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর ছয় মাস পার হওয়ার পরও প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র এক হাজার ৪০৯.০২ কোটি টাকা। দুই হাজার ৩৩৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার প্রকল্পে এটি মোট ব্যয়ের মাত্র ৬০.৩৬ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ভৌত অগ্রগতির কথা বলা হলেও তা আর্থিক অগ্রগতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কাজের গতি মন্দা হওয়ার কারণে মেয়াদ বেড়ে যায়। ফলে ধীরগতির জন্য নানান অজুহাত প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তোলা হয়।
দেরি ও খরচ বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রকল্পে বাংলাদেশী মুদ্রার খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। ডিপিপি প্রস্তুতকালীন সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালে বিনিময় হার ছিল ১ ডলার= ৮৫ টাকা। বর্তমানে ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে (১ ডলার=১২২ টাকা) প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তদুপরি আন্তর্জাতিক বাজারে কোভিড-পরবর্তী সময় ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সাল হতে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি পেলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর ঋণের পরিমাণ পূর্বের মতো ১৬ কোটি মার্কিন ডলার অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন না হলেও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে একই পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের সমমূল্য পরিশোধে অধিক বাংলাদেশী মুদ্রার সংস্থান প্রয়োজন হয়েছে। শুধুমাত্র ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলেই প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে বাংলাদেশী মুদ্রায় অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি ৫৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা প্রকল্প সাহায্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
আর মূল ডিপিপি-তে গৃহস্থালী অঙ্গে ৬০ কোটি টাকা ছিল। মূল ডিপিপি-তে গৃহ সংযোগ ধরা হয়েছিল গ্রাহকের বাড়ির সীমানা পর্যন্ত। স্যুয়ার পাইপলাইন মাটির ৯ থেকে ১০ ফুট, কোথাও কোথাও এর বেশি গভীরে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে বাড়ির মালিকদের পক্ষে বাড়ির সেপটিক ট্যাংক হতে স্যুয়ার লাইনের ম্যানহোল পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন কাজটি যথাযথ লেভেল মেইনটেইন করে মাস্টার ট্র্যাপ, পিট খনন, প্লাম্বিং ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করা কারিগরি এবং আর্থিক দিক থেকে কষ্টসাধ্য। গৃহসংযোগ যথাযথভাবে না হলে প্রকল্পের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সুপারিশের ভিত্তিতে বাড়ির অভ্যন্তরে গৃহসংযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ইং তারিখে প্রকল্পের প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভায় সংযোগ এর বিষয়টি সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন-পূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি গত ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে স্যুয়ারেজ গৃহসংযোগের বিষয়ে বাড়ির মালিকের অভ্যন্তরীণ ইন্সপেকশন পিট এবং প্লাম্বিং কাজসহ করার মতামত প্রদান করে। বাড়ির অভ্যন্তরে গৃহসংযোগের সংস্থান করার জন্য অতিরিক্ত পাইপ, মাস্টার ট্যাপ, পিট খনন, প্লাম্বিং ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করার ফলে ১৭০ কোটি ৪২.৬০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরডিপিপি-তে ২৩০ কোটি ৪২.৬০ লাখ টাকা হয়েছে।
রাস্তা মেরামত ও বিদ্যমান ইউটিলিটির পুনর্বাসন অঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধিতে মূল ডিপিপিতে এ অঙ্গে ৭৮ কোটি টাকা ছিল। গত ১৩ জুলাই ২০২৫ অনুষ্ঠিত পিএসসি সভার সিদ্ধান্ত (৩.৩.২) ছিল যে ‘ঢাকা ওয়াসার মতো খুলনা ওয়াসা, খুলনা সিটি করপোরেশনের সাথে এমওইউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে রাস্তা নিজ খরচে মেরামত করে দেয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ আলোকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক গত ২০২৫ সালে এ-সংক্রান্ত কমিটি গঠন করে দেয়। এ কমিটির ২০২৫ সালের অক্টোবর সিদ্ধান্ত হয় মহানগরীতে স্যুয়ার পাইপ লাইন স্থাপনে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা কেসিসির পরিবর্তে খুলনা ওয়াসা এই প্রকল্পের আওতায় মেরামত করে দেবে। উল্লেখ্য খুলনা সিটি করপোরেশনের রাস্তা কাটা ক্ষতিপূরণ বাবদ অতিরিক্ত ৬.৪১ কোটি টাকা প্রাক্কলন প্রস্তাব করেছিল। মূল ডিপিপি-তে রাস্তা রিস্টোরেশন খাতে খননকৃত রাস্তার প্রস্থ ১ মিটার বিবেচনা করে সংস্থান ছিল সেখানে মাঠপর্যায়ে স্যুয়ার পাইপ নেটওয়ার্ক স্থাপন কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রস্থ গড়ে ২.০ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া মাঠপর্যায়ের উপকারভোগী গ্রাহকদের সুবিধার্থে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে প্রকল্পের পরামর্শক ও প্রকৌশলী দ্বারা সার্ভে করে এই বিষয়ে জরিপ করা হয়। জরিপের ভিত্তিতে রাস্তা রিস্টোরেশন বাবদ খরচ অতিরিক্ত ২০৪ কোটি ৫ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে আরডিপিপি-তে ২৮২ কোটি ৫ লাখ টাকা হয়েছে।
তারা বলছেন, প্রকল্পের অনেক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানি করতে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। আর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডলারের বিনিময় হার বাড়ার কারণে পাইপলাইন, পাম্প এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। সিমেন্ট, বালি, ইট, রড এবং ডিজেলের দাম লাগামছাড়াভাবে বেড়েছে। ফলে মূল অনুমোদিত বাজেটে কাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পয়ঃনিষ্কাশন লাইন ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজে এই সামগ্রীগুলোর প্রচুর প্রয়োজন। সরকারি নীতিমালার পরিবর্তনের ফলে ভ্যাটের হার ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
খরচ ও মেয়াদ বৃদ্ধির পরও শঙ্কা
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, একনেকের অনুমোদনের পর কাজের গতি বাড়বে। তবে প্রশ্ন উঠছে, সাড়ে পাঁচ বছরে মাত্র ৭০ শতাংশ অগ্রগতি হলে, বাকি ৩০ শতাংশ কাজ বাকি ১.৫ বছরে (২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত) শেষ করা কতটা বাস্তবসম্মত? ডলারের দাম ও নির্মাণসামগ্রীর দাম এখনো অস্থিতিশীল। ফলে প্রকল্পটি আবারো সময় ও ব্যয় বাড়ানোর চক্রে পড়বে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।








