
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় বাংলাদেশের পরিবর্তন, সম্ভাবনা ও সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ’। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা ও সংস্কৃতির নানা পরিবর্তন উঠে এসেছিল এ প্রতিবেদনে। একইসাথে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, মোবাইল ফোন হারানোর ভোগান্তি, সড়ক যোগাযোগের বেহাল দশা, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের জনবল সঙ্কট এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছিল পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায়।
প্রথম সংখ্যায় সংবাদ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি ছিল সম্পাদকীয়, রাজনৈতিক চিন্তাবিষয়ক নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে প্রতিবেদন। সব মিলিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সমস্যা, দুর্ভোগ ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরার একটি বিস্তৃত প্রয়াস দেখা যায় সংখ্যাটিতে।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো তুলে ধরা হলো—
প্রধান শিরোনাম ‘বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ’
মাসুমুর রহমান খলিলীর লেখা ‘বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন দশকে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সব পরিবর্তন ইতিবাচক না হলেও নানা বিপর্যয় সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। হতাশা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখার মতো শক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।
প্রতিবেদনটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অস্থিরতা এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে পরপর তিনটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিকেও রাজনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১০০ ডলারের নিচে; তখন তা বেড়ে সাড়ে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছিল। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি। একইসাথে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, ইউরোপ-আমেরিকার চেইন শপে বিক্রির উপযোগী পণ্য রফতানি, বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পরিচিতি বৃদ্ধি এবং বাজেটের বিদেশী ঋণনির্ভরতা কমার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনের হিসাবে, ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে ওই সময় বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল দুই হাজার কোটি টাকা।
সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষের গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুহার, সাক্ষরতা, স্কুলে ভর্তি, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, জ্বালানি ব্যবহার এবং মোবাইল ফোনের বিস্তারে অগ্রগতির কথা উঠে আসে। কৃষিতে খাদ্য ঘাটতি কমে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘সুপার রাইস’ গবেষণা, মৎস্য চাষের বিস্তার এবং পশুপালন খাতের অগ্রগতিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পায়।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায় মানুষের সক্ষমতার কথাও তুলে ধরা হয়। শিক্ষার বিস্তার, টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির প্রসার এবং যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নকে সমাজের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, অপসংস্কৃতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও খুনোখুনির মতো সমস্যার কথাও বলা হয়। প্রতিবেদনের শেষাংশে প্রশ্ন তোলা হয়—এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ কি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে না?
নির্বাচন কমিশনের বয়সসীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা
প্রথম সংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলোর একটি ছিল শাহীন রাজার লেখা ‘এম এ সাঈদ ও সফিউর রহমানের বিদায় আসন্ন’। এর উপশিরোনাম ছিল ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সদস্যদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে’।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আগাম নির্বাচনের প্রয়োজন হলে প্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করছিল সরকার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের বয়সসীমা ৬২ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে নির্ধারণের চিন্তাভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও উঠে আসে।
তৎকালীন সরকারের ধারণা ছিল, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে এবং নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে। এতে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের জনবল বাড়ানো, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচনে কালোটাকার ব্যবহার ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা ছিল। প্রার্থীদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, পরিবার-পরিজনের হিসাব ও আয়ের উৎসের বিবরণ নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ ২০০০ সালের ২৩ মে শপথ নিয়েছিলেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালের ২৩ মে। প্রতিবেদনে তার বয়স ৬৭ বছর অতিক্রম করার কথা উল্লেখ করা হয়। কমিশনার সফিউর রহমানের মেয়াদ ২০০৫ সালের ২৪ জুন এবং মুসেফ আলী ও মোহাম্মদ আলীর মেয়াদ ২০০৬ সালের ১৮ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তখন জানান, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না এবং সংশোধনীর উদ্যোগ থাকলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্র ও বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার বক্তব্যে সরকারের পরিকল্পনার কথা উঠে এলেও প্রস্তাবটি কখন বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
প্রতিবেদনে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনারদের পাঁচ বছরের মেয়াদ, কমিশনের স্বাধীনতা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো একই পদ্ধতি ও কারণে তাদের অপসারণের বিধানের কথাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর বিচারপতি এম ইদ্রিস থেকে শুরু করে বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম, বিচারপতি এ টি এম মাসুদ, বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ, বিচারপতি এ কে এম সাদেক এবং পরে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আবু হেনার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়। এম এ সাঈদের নিয়োগ ও তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগ এবং তার পদত্যাগের দাবির কথাও প্রতিবেদনে স্থান পায়।
প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি মোবাইল ফোন খোয়া যাওয়ার চিত্র
তৌহিদুল ইসলামের লেখা ‘প্রতিদিন খোয়া যাচ্ছে পাঁচ হাজার মোবাইল ফোন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন চারটি মোবাইল কোম্পানির গ্রাহকসংখ্যা ছিল ২০ লাখের বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক সিম রিপ্লেসমেন্ট বা পুনঃসংযোগ নিতে আসতেন। এই হিসাবের ভিত্তিতে প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি মোবাইল ফোন খোয়া যাওয়ার ধারণা দেয়া হয়। তবে এ বিষয়ে নির্ভুল কোনো পরিসংখ্যান ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফোন হারানো, পকেটমার, চুরি ও ছিনতাইকে মোবাইল খোয়া যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফোন হারানোর পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জানিয়ে সংযোগ বন্ধ করা, নতুন সেট ও সিম সংগ্রহ—সব মিলিয়ে গ্রাহকদের অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হতো। সংযোগ বন্ধ না করলে ফোনটি অন্যের হাতে গিয়ে ব্যবহার হওয়ার কারণে গ্রাহকের অতিরিক্ত বিলের ঝুঁকিও থাকত।
প্রতিবেদনে তখনকার বাজারদর অনুযায়ী হারানো নম্বরটি পুনরায় চালু করতে কমপক্ষে পাঁচ হাজার ৩৭৫ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়। এর মধ্যে নতুন ফোন সেটের দাম প্রায় চার হাজার ৫০০ টাকা, থানায় জিডি করতে ১০০ টাকা ঘুষ, নতুন সিমের জন্য ৫৭৫ টাকা এবং থানা ও মোবাইল কোম্পানিতে যাতায়াতে কমপক্ষে ২০০ টাকা ধরা হয়েছিল।
মোবাইল কোম্পানিগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের হিসাবও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ। ঢাকার গুলশান এভিনিউয়ের ইনফো সেন্টার ও মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনের সেবাকেন্দ্রে প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ হাজার গ্রাহকের সমাগম ঘটত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইনফো সেন্টারে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ জন নতুন সিম নিতে আসতেন এবং সেনাকল্যাণ ভবনের কেন্দ্রে এক দিনে সর্বোচ্চ এক হাজার ৩৩৩ জনের সিম সংগ্রহের রেকর্ড ছিল।
একটেলের গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ। তাদের সেবাকেন্দ্রে এক দিনে সর্বোচ্চ ৩৮৮ জন সিম রিপ্লেসমেন্টের জন্য এসেছিলেন। সেবা টেলিকমের গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ; এক সপ্তাহে এক হাজার ১৭২ জন হারানো মোবাইলের জন্য নতুন সিম নিতে এসেছিলেন। সিটিসেলের গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। সিমকার্ডবিহীন ওই সেবার গ্রাহকদের অনেকেই ফোন হারালে পুরোনো সংযোগ পুনরুদ্ধারের বদলে নতুন সেটসহ নতুন সংযোগ নিতেন। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ জন লাইন রিপ্লেসমেন্টের জন্য আসতেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদনটির বক্তব্য ছিল, মোবাইল ফোন হারিয়ে গ্রাহকরা আর্থিক ক্ষতি ও প্রশাসনিক ঝামেলায় পড়লেও নতুন সিম বিক্রির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোও আয় করত।
প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় : ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’
নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’ শিরোনামে বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এতে সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে তথ্য ও প্রগতির কথা তুলে ধরে সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকার অঙ্গীকার করা হয়। পত্রিকাটির স্লোগান ছিল ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’।
সম্পাদকীয়তে পাঠক, লেখক, পৃষ্ঠপোষক, শুভানুধ্যায়ী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের সহযোগিতা কামনা করা হয়। সব মত ও পথ প্রকাশের সুষ্ঠু মাধ্যম হওয়া, মতপ্রকাশে সহনশীল পরিবেশ গড়ে তোলা, জনসাধারণের সমস্যা ও দুর্ভোগ তুলে ধরা এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সমস্যার সমাধানে জ্ঞানী ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
একইসাথে সংবাদপত্রকে পারিবারিক পাঠের উপযোগী করে তোলা এবং সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে পত্রিকার মূল্য যথাসম্ভব কম রাখার কথা বলা হয়। পাঠকদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে পত্রিকার প্রতিদিনের পথচলা সহজ করার প্রত্যাশাও সম্পাদকীয়তে প্রকাশ করা হয়।
চিন্তার স্বাধীনতা ও রাজনীতি
প্রথম সংখ্যায় কবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারের ‘‘চিন্তার স্বাধীনতা ও রাজনীতি নিয়ে কয়েকটি ‘সহিষ্ণু’ মন্তব্য’’ শিরোনামের একটি দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধে রাজনীতি, সহিষ্ণুতা, ভিন্নমত এবং চিন্তার স্বাধীনতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়।
লেখাটিতে বলা হয়, রাজনীতির কাজ শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভিন্ন চিন্তা ও মতকে সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা যাবে না। চিন্তার স্বাধীনতাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়। নিবন্ধে আরো বলা হয়, চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
সড়ক যোগাযোগের বেহাল দশা
প্রথম সংখ্যায় সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের দুরবস্থা নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, পরপর বন্যা ও দুই দফা টানা ভারী বর্ষণে জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং অধিকাংশ জেলা-উপজেলা সংযোগ সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সড়কের ইট ও পাথর উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় অনেক পথ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল।
খানাখন্দের কারণে যানবাহন বিকল হওয়া, বাস-ট্রাক ও হালকা যানবাহন উল্টে দুর্ঘটনায় পড়া এবং যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে শ্যামলী থেকে গাবতলী হয়ে সাভার পর্যন্ত সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সেটিকে মেঠোপথের সাথে তুলনা করা হয়।
সড়ক যোগাযোগ সচিব জানান, সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পুনর্বাসনে বরাদ্দ বাড়াতে সম্মত হলেও ঋণচুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষয়ক্ষতি নজিরবিহীন হলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি মেরামত চলছিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের আওতাধীন গ্রামীণ সড়কগুলোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উঠে আসে।
চট্টগ্রামে জনবল সঙ্কটে পুলিশ
‘অপরাধ দমনে হিমশিম খাচ্ছে সিএমপি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের জনবল সঙ্কট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। উপশিরোনামে বলা হয়, ৪০ লাখ মানুষের বিপরীতে পুলিশ ছিল মাত্র চার হাজার।
চট্টগ্রাম ব্যুরোর শামসুল ইসলামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ বছরে নগরীর জনসংখ্যা ২২ লাখ বেড়েছিল, কিন্তু পুলিশের সংখ্যা বেড়েছিল মাত্র এক হাজার। ১৯৮৬ সালে নগরীর আয়তন ছিল ১২৮ বর্গমাইল, জনসংখ্যা ১৮ লাখ, থানা ছয়টি এবং পুলিশ সদস্য তিন হাজার ১৭৬ জন। ২০০৪ সালে নগরীর আয়তন বেড়ে ১৫১ বর্গমাইল, থানা ১২টি এবং জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি হয়। সে সময় পুলিশ সদস্য ছিলেন চার হাজার ২০০ জন; অর্থাৎ প্রতি ৯৫০ জনের জন্য একজন পুলিশ সদস্য।
সেপ্টেম্বর ২০০৪-এর হিসাব অনুযায়ী, সিএমপিতে অনুমোদিত জনবল ছিল চার হাজার ৫৬৯ জন। এর মধ্যে ৯১ জন কর্মকর্তা এবং আরো প্রায় সাড়ে ৩০০ পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ শূন্য থাকার পাশাপাশি উপ-পুলিশ কমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, এএসআই, হেড কনস্টেবল, নায়েক ও কনস্টেবলের বিভিন্ন পদেও শূন্যতা ছিল।
সিএমপি কমিশনার আমজাদ হোসেন সীমিত সম্পদ ও জনবল নিয়েই নগরবাসীর নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, পরীক্ষা, ভিআইপি প্রটোকল, অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার দায়িত্ব পালন করতে হতো। অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ এবং জনবল সঙ্কটের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হতো।
চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও বিনোদন
ইকবাল করিম নিশানের ‘বেসামাল সেন্সরের কারণে ধ্বংসের মুখে ঢাকার চলচ্চিত্র’ শিরোনামের নিবন্ধে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্কট তুলে ধরা হয়। এতে সেন্সর বোর্ডের ভারসাম্যহীন নীতি, অশ্লীল ও কাটপিস ছবির বিস্তার, বিদেশী চলচ্চিত্রের হিন্দি সংস্করণের প্রবেশ এবং দেশীয় ঐতিহ্য ও ভাষার ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। চলচ্চিত্রের জন্য সুনির্দিষ্ট সেন্সর নীতিমালা প্রণয়ন এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
‘সাক্ষাৎকার প্রতিদিন’ বিভাগে নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতুল্লাহকে নিয়ে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এতে তার নাচের সাথে সম্পর্ক, প্রশিক্ষণ, নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণ, সমসাময়িক শিল্পী, বিদেশ সফর এবং বাংলাদেশে নাচের দর্শক ও টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখার সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা ছিল।
পত্রিকাটির ‘জানা-অজানা’ বিভাগে ‘মিসরের হাজার বছরের পুরনো মড়াকে মমি বলে কেন?’ শিরোনামের ছোট নিবন্ধে ‘মমি’ শব্দটির উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘মমি’ শব্দটি পারস্যের ‘ম্যামিয়া’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ পিচ বা আলকাতরা। প্রাচীন মিসরের ‘মৃতদেহ’ কালচে হয়ে যাওয়ায় সেগুলোকে পিচ বা আলকাতরা দিয়ে তৈরি বলে মনে করা হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যাও দেয়া হয়।
ক্রিকেট, বিদ্যুৎ ও সরকারি সিদ্ধান্ত
খেলাধুলার পাতায় ‘আট কোটি টাকার ক্রিকেটে দল বদল’ এবং ‘স্পিনার ও ব্যাটসম্যানরা হবেন চট্টগ্রামে হিরো’ শিরোনামের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ক্রিকেটের দলবদল এবং চট্টগ্রামে স্পিনার ও ব্যাটসম্যানদের ভূমিকা ছিল এসব প্রতিবেদনের মূল বিষয়।
বিদ্যুৎ খাতে ‘একের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ছে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ঈদের পর শীত মৌসুমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। নাজমুল হেসেনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বছরে দুই দফা দাম বাড়ানোর প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়ার আলোচনা চলছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন (আইএফসি) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে চাপ দিচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, মূল্য সমন্বয়ের দায়িত্ব সরকার নয়, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পালন করবে। কমিশনের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন জানান, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো, জনবল ও নীতিমালা তৈরি না হওয়ায় তখনো দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী বছরে দুই দফায় পাঁচ শতাংশ করে দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং বছরে একবার দাম বাড়লে সাত থেকে আট শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির হিসাবও উল্লেখ করা হয়। বিদ্যুৎ বিক্রিতে সরকারের লোকসানের কথাও তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক সংবাদে ‘দলীয় কর্মীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য প্রকাশিত হয়। বিএনপির খুলনা ও সিলেট বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জনগণকে সজাগ করতে এবং সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে বলেন। সন্ত্রাস দমনে র্যাবের ভূমিকা ও বন্যা মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও প্রান্তিক জীবনের গল্প
নূরুর রহমানের ‘জিপিওতে এক দিন’ প্রতিবেদনে ঢাকার জেনারেল পোস্ট অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে নূরজাহান বেগম, নিজামউদ্দিন ও আবদুস সামাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কাউন্টার থেকে কাউন্টারে ঘোরা, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, কর্মীদের দুর্ব্যবহার এবং অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ দ্রুত করিয়ে নেয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়।
নূরজাহান বেগম সিঙ্গাপুরে পড়ুয়া ছেলের কাছে ওষুধ পাঠাতে গিয়ে এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ঘুরে শেষ পর্যন্ত ৩০ টাকা সেলামি দিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসে একই পার্সেল পাঠাতে এক হাজার ২০০ টাকা লাগলেও পোস্ট অফিসে খরচ ছিল ২৩৫ টাকা। প্রতিবেদনে সরকারি সেবায় নিয়মকানুনের জটিলতা ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণের সমালোচনা করা হয়।
সত্য, দেশপ্রেম ও সংবাদপত্রের দায়িত্ব
মাসুদ মজুমদারের ‘সবাই আমাদের বন্ধু, কিন্তু সত্য সবচেয়ে বড় বন্ধু’ শিরোনামের লেখায় নয়া দিগন্তের সংবাদ-দর্শন ও অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, পত্রিকাটি গণমানুষের কথা, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে চায়। সামাজিক অন্যায়, যৌতুক, মাদক, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতার মতো বিষয় প্রকাশে বস্তুনিষ্ঠ থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়। লেখাটিতে নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নেয়া এবং সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকার কথা বলা হয়।
‘চিন্তাধারা’ বিভাগে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার প্রথম প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচের ‘নৈতিকতা ও ধর্ম’ শিরোনামের লেখা অনুবাদ আকারে প্রকাশিত হয়।
পাশাপাশি ‘বিদেশী সম্পাদকীয় থেকে’ বিভাগে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর ‘গোয়েন্দা তথ্য কিভাবে বাঁকা করতে হয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এতে ইরাকের কথিত বিপজ্জনক অস্ত্র ও আল-কায়েদার সাথে সম্পর্কের অভিযোগ, মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা এবং গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ ও আঞ্চলিক বিরোধ
আন্তর্জাতিক সংবাদে পাকিস্তান ও ভারতের প্রতি কমনওয়েলথ মহাসচিব ডন ম্যাককিননের কাশ্মির বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান প্রকাশিত হয়। ইসলামাবাদ সফরে তিনি দুই দেশকে শান্তির স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার পরামর্শ দেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ও প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজের সাথে তার বৈঠক এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কমনওয়েলথের সহায়তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সিনহুয়ার পাঠানো ‘টিভিতে হাজির হলেন পরলোকগত সুপারম্যান’ শিরোনামের খবরে অভিনেতা ক্রিস্টোফার রিভের মৃত্যুর পর প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনের কথা বলা হয়। বিজ্ঞাপনে তিনি স্টেমসেল গবেষণার পক্ষে সমর্থন চেয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রস্তাব ৭১ পাস হলে মানব ভ্রূণের স্টেমসেল গবেষণায় রাজ্যের ৩০০ কোটি ডলার ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরতেন কুয়াকাটার জেলেরা
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে আবু সালেহ আকনের লেখা ‘রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরতেন কুয়াকাটার জেলেরা’ নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় জেলার সমস্যা, সম্ভাবনা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরার উদ্যোগও ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জীবন নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরে কুয়াকাটার জেলেরা’ শিরোনামের প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে প্রতিটি জেলারই রয়েছে নিজস্ব সমস্যা, সম্ভাবনা, সাফল্য ও ব্যর্থতা। কিন্তু অনেক সময় এসব সমস্যা ও সম্ভাবনার যথাযথ চিত্র সামনে আসে না। ফলে সম্ভাবনাগুলো বাস্তব সাফল্যে রূপ নিতে পারে না। এ বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন জেলার সমস্যা, সম্ভাবনা ও সাফল্য তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েছিল নয়া দিগন্ত। প্রথম পর্যায়ে বেছে নেয়া হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালীকে।
রাখাইন তাঁতশিল্প ও ঢাকা বাইপাস প্রকল্প
‘বাংলার দিগন্ত’ বিভাগে ‘বিলুপ্তির পথে বরগুনার রাখাইনদের তাঁতশিল্প’ শিরোনামের প্রতিবেদনে তালতলীসহ বরগুনা ও পটুয়াখালীর রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সংকট তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পুঁজির অভাব, বাজারজাতকরণের সমস্যা, ব্যাংকঋণের জটিলতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ শিল্প বিলুপ্তির পথে। একসময় কয়েক হাজার রাখাইন পরিবার তাঁতশিল্পের সাথে যুক্ত থাকলেও তখন কলাপাড়া ও তালতলী এলাকায় প্রায় ১০০ পরিবার এ পেশায় যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
লুঙ্গি, চাদর, তোয়ালে ও ব্যাগ তৈরির এ ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, ন্যায্যমূল্যে উপকরণ সরবরাহ, সরকারি সহায়তা এবং অবৈধ পথে বর্মিজ পণ্যের প্রবেশ ঠেকানোর দাবি জানান রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্যরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, তুলনামূলক কম দামে ও চাকচিক্যময় হওয়ায় বর্মিজ পণ্য বাজার দখল করছিল, যদিও রাখাইনদের দাবি ছিল তাদের বোনা কাপড় বেশি টেকসই।
অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে ‘ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন করেনি’ শিরোনামে বলা হয়, প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সেটি অনুমোদন করেনি। প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ১৪৭ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা ৩১৭ কোটি টাকা হয়। তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং একনেকের বিকল্প চেয়ারম্যান এম সাইফুর রহমান জানান, প্রকল্প ব্যয় ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব কি না, তা পুনর্বিবেচনা করতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়। একই বৈঠকে প্রায় দুই হাজার ৫৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়, যার মধ্যে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প-২ উল্লেখযোগ্য ছিল। এতে এডিবির ৭৫০ কোটি টাকা দেয়ার কথা ছিল।
প্রথম সংখ্যার সামগ্রিক চিত্র
নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নিবন্ধগুলোতে একদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছিল, অন্যদিকে নির্বাচনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দুর্ভোগ, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, চলচ্চিত্রশিল্প ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্কটও সামনে আনা হয়েছিল। জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও গুরুত্ব পেয়েছিল।
প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটির অঙ্গীকার ছিল—সত্য ও তথ্য প্রকাশে আপসহীন থাকা, সব মত ও পথের প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং মানুষের সমস্যা ও দুর্ভোগকে সংবাদপত্রের আলোচনায় নিয়ে আসা। ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যার বিষয়বৈচিত্র্যেও সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যায়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








