
‘গ্লোবাল সাউথ’ বা ‘বৈশ্বিক দক্ষিণ’ শব্দটি বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। এটি মূলত বিশ্বের উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত বা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। গ্লোবাল সাউথের প্রায় সব দেশই অতীতে ইউরোপীয় বা অন্যান্য পরাশক্তির উপনিবেশ ছিল। এসব দেশের মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম, শিল্পায়ন এখনো চলমান এবং অনেকেই কৃষিনির্ভর অথবা কাঁচামাল রফতানির ওপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা এই দেশগুলোর সাধারণ সমস্যা।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন আর কেবল সাহায্যপ্রার্থী নয়। ব্রিকস, যার মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া (যদিও রাশিয়াকে পুরোপুরি সাউথ বলা যায় না), ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমা জি-৭ জোটের সমকক্ষ হয়ে উঠছে। জাতিসঙ্ঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় গ্লোবাল সাউথের ভোট এখন যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় গ্লোবাল সাউথের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান। বর্তমানে ভারত, চীন ও ব্রাজিল নিজেদের গ্লোবাল সাউথের প্রধান কণ্ঠস্বর বা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
গ্লোবাল সাউথের প্রধান চ্যালেঞ্জ
গ্লোবাল সাউথ কোনো একক বা সমজাতীয় জোট নয়। ভারত, চীন বা ব্রাজিলের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির পাশে আফ্রিকার অত্যন্ত দরিদ্র দেশগুলোও এর অংশ। ফলে সবার স্বার্থ ও সমস্যা এক নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গ্লোবাল নর্থের উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে বেশি দায়ী হলেও, এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব (যেমন বন্যা, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি) ভোগ করছে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশ। দেখা যাচ্ছে, গ্লোবাল সাউথ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয়। এটি বিশ্বের সেই অংশের প্রতিনিধিত্ব করে যা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আরো বেশি সমতা, সংস্কার ও ন্যায্য অধিকার দাবি করছে।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক
গ্লোবাল সাউথের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বাংলাদেশ কেবল গ্লোবাল সাউথের সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই নয়; বরং এই অঞ্চলের অধিকার আদায়ে বৈশ্বিক মঞ্চে অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
১. গ্লোবাল সাউথের অধিকাংশ দেশের মতোই বাংলাদেশেরও রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ মূল পররাষ্ট্রনীতি— সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়, অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ কখনোই কোনো পরাশক্তির সাথে কোনো সামরিক জোটে জড়ায়নি, যা গ্লোবাল সাউথের মূল রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।
২. জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ আদায়ের লড়াইয়ে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে।
৩. উন্নত দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো যখন নিজেদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াচ্ছে (যা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নামে পরিচিত), বাংলাদেশ সেখানে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু মডেল বা অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা আফ্রিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশ অনুসরণ করছে। এমনকি সম্প্রতি নেপালও তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি ‘পোস্টাল ভোটিং প্রযুক্তি ও মডেল’ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
৪. জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানো দেশগুলোর শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে, যেমন— দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সরাসরি অবদান রাখছে। এছাড়া মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের মানবিক দায়িত্বশীলতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে।
৫. বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বর্তমান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল সাউথের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও ভারত। উভয়ের সাথেই বাংলাদেশ ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বজায় রাখছে। একই সাথে ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য পদ পাওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক সাউথের অর্থনৈতিক বলয়ে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান আরো দৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশ যেভাবে লাভবান হচ্ছে
উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প উৎস। পশ্চিমা দাতা সংস্থা বা ব্যাংকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে বড় অবকাঠামো, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ ও তহবিল সুবিধা পাচ্ছে। ইউরোপ বা আমেরিকার প্রথাগত বাজারের বাইরে গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরী পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, প্লাস্টিক এবং চামড়াজাত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে এবং রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আসছে। বৈশ্বিক সাউথের দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কমিয়ে স্থানীয় বা বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশও চীন, ভারত বা অন্যান্য দেশের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের সুবিধা পাচ্ছে।
এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী মঞ্চ ব্যবহার করে উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে জলবায়ু তহবিল ও ক্ষতিপূরণ আদায়ে যৌথ দরকষাকষির সুবিধা পাচ্ছে। একই সাথে কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার মাধ্যমে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি সহজে বিনিময় করতে পারছে। গ্লোবাল সাউথের একটি প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে (যেমন জাতিসঙ্ঘ বা ডব্লিউটিও-তে) বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও কণ্ঠস্বর জোরদার হয়েছে।
রফতানি বহুমুখীকরণ পরিকল্পনা
বাংলাদেশের রফতানি বহুমুখীকরণ পরিকল্পনা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। এর ফলে তৈরী পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতি আরো টেকসই হবে। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, তখন শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁঁকি মোকাবেলায় এই পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিশ্বের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে লক্ষ্য করে একটি পৃথক, বাজারভিত্তিক এবং সমন্বিত রফতানি কৌশল প্রণয়ন করছে। দেশগুলোর মধ্যে আছে গ্লোবাল সাউথের বৃহৎ ও উদীয়মান অর্থনীতি চীন, ভারত, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ইরান ও তুরস্ক। প্রতিটি দেশের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে এই পৃথক কৌশল তৈরি করা হচ্ছে। রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে সরকার তৈরী পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, আইটি ও সফটওয়্যার পরিষেবা এবং সিরামিক খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছে।
গ্লোবাল সাউথের একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো। বর্তমানে বৈশ্বিক হলাল পণ্যের ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের অংশ সামান্য। সরকার আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্যপণ্য রফতানি বাড়ানোর নীতিগত উদ্যোগ নিচ্ছে।
রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে সরকার সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগকে কাজে লাগাচ্ছে। পরিকল্পনার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো শুধু পণ্য রফতানি নয়; বরং দক্ষ জনবল ও সেবা খাতের রফতানি বৃদ্ধি করা। আইটি আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং এবং আইসিটি ডোমেইনে গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সাথে সেবামূলক বাণিজ্যের সুযোগ বাড়াতে সরকার ডিজিটাল অবকাঠামো সংস্কারে গুরুত্ব দিচ্ছে।
নীতিমালায় সংস্কার প্রয়োজন
গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় বেশ কিছু কৌশলগত সংস্কার আনা জরুরি। যেমন, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর (বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা) সাথে বাণিজ্য বাড়াতে শুল্ক কাঠামোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক বা ট্যারিফ লাইন কমানো এবং কাস্টমস পাসের জটিল প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসে রূপান্তর করা। বাংলাদেশ এখনো তৈরী পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। গ্লোবাল সাউথের বাজারে ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া, প্লাস্টিক ও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের বিশাল চাহিদা রয়েছে। তাই এসব খাতে শুল্ক ছাড়, ট্যাক্স হলিডে এবং বিশেষ রফতানি প্রণোদনা দেয়ার নীতি সংস্কার করতে হবে। বিকল্প মুদ্রা ও ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন : ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথের প্রস্তাবিত বিকল্প বা স্থানীয় মুদ্রা ব্যবস্থায় লেনদেন আরো সহজ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি সোয়াপ (Currency Swap) নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবস্থাকে আরো নমনীয় ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো গ্লোবাল সাউথের বৃহৎ অর্থনীতিগুলো থেকে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর নীতি সংস্কার। মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার (Profit Repatriation) ) আইন এবং আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে হবে।
গ্লোবাল সাউথের নতুন ও উদীয়মান বাজারগুলোতে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনার জন্য পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে দক্ষ নেগোসিয়েটর বা লবিস্ট তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তন করতে হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








