নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক এড়িয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প

 দ্য টাইমস অব ইসরাইল ও রয়টার্স

আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে জনসমর্থন বাড়াতে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে নিউ ইয়র্ক সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার কোনো দ্বিপীয় বৈঠকের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঠিক এক মাস আগে তিনি জাতিসঙ্ঘে ভাষণ দিচ্ছেন। নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পেতে নেতানিয়াহুর মতাসীন জোট এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
কূটনৈতিক প্রতিবেদক লাজার বারম্যান লিখেছেন, নেতানিয়াহুর কার্যালয় ট্রাম্পের সাথে একটি বৈঠকের আয়োজন করার চেষ্টা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘দৃশ্যত এটি বাস্তবায়নে অনিচ্ছুক ছিলেন’। এই সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির সাথে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। তবে পরবর্তী মেয়াদের জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি এখনো স্পষ্টভাবে কোনো সমর্থন জানাননি তিনি। ট্রাম্প এক সপ্তাহ আগের একটি জরিপের ফল শেয়ার করেন, যেখানে নেতানিয়াহুর জোট প্রতিপদের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে ছিল। বারম্যানের মতে, সেখানেও নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন করেননি ট্রাম্প। বারম্যান লিখেছেন, ট্রাম্পের সাথে বৈঠক সম্ভব হলে নেতানিয়াহু তার অতীতের নির্বাচনী প্রচারণার সেই পুরনো দাবি নতুন করে তুলে ধরার সুযোগ পেতেনÑ যেখানে তিনি বলতেন যে, বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সুসম্পর্কই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের, বিশেষ করে গাদি আইজেনকোটের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বৈঠকটি হলে ইরান, লেবানন ও গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে সরাসরি ট্রাম্পের সাথে কথা বলার সুযোগ পেতেন নেতানিয়াহু। বারম্যান মনে করেন, এটি তাকে নির্বাচনী প্রচারণায় আবারো প্রমাণ করার সুযোগ দিত যে, তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতার’ নেতা।
নিজ দেশেও নানা রাজনৈতিক সঙ্কটে জর্জরিত নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আকস্মিক হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, ওই ঘটনার রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনে অনীহা, তার বিদায়ী জোটের প থেকে হারেদিমদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি না করার একগুঁয়েমি এবং সমাজে চরমপন্থার বিস্তার নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ সাধারণ ভোটাররা। নেতানিয়াহু বিশ্বনেতাদের সামনে বক্তব্য রাখবেন ঠিকই, তবে বারম্যানের মতে, ‘তার মূল ল্যবস্তু’ হবেন নিজ দেশের সাধারণ ভোটাররা, যারা ইসরাইলে বসেই তার এই বক্তব্য প্রত্য করবেন। গাজা, লেবানন ও ইরানে তিনটি ‘অমীমাংসিত সামরিক অভিযানের’ পর দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজেকে এখনো সেরা পছন্দ হিসেবে ভোটারদের কাছে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সামনে। গাজা প্রসঙ্গে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সেখানকার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকার ওপর ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নেতানিয়াহু তার ভাষণে তুলে ধরতে পারেন এবং হাউছির পাশাপাশি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে পারেন। যদিও নেতানিয়াহু কিভাবে এটি বাস্তবায়ন করবেন, তা এখনো পরিষ্কার করেননি বলে জানান বারম্যান।
বারম্যান আরো বলেন, গাজা থেকে সব বন্দীর প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে নেতানিয়াহু বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। তবে জীবিত অবস্থায় আটক হওয়া ৪০ জনেরও বেশি মানুষ যে পরবর্তী সময়ে নিহত হয়েছেন বা বন্দিদশায় মারা গেছেন, তা তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন। লেবানন প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর য়তি এবং দেশটির দণিাঞ্চলে ইসরাইলের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতির ওপর জোর দিতে পারেন। তবে বারম্যানের যুক্তি, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের পর লেবাননের সশস্ত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার যে পরিকল্পনা, তাতে হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করা সম্ভব নয়। ইরানের সার্বিক পরিস্থিতিও নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীা। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ইরান দুর্বল হলেও হরমুজ প্রণালী কিংবা পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো ‘ছাড় দিতে রাজি’ এমন কোনো লণ নেই বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি না হওয়া সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ফলাফলকে নেতানিয়াহুর ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরতে হতে পারে। একই সাথে জাতিসঙ্ঘের এই ভাষণটি তেহরানের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করার একটি প্রয়াস হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর বরাতে বিশ্লেষণে বলা হয়, জাতিসঙ্ঘে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং সমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা সম্পর্কিত নতুন তথ্য উপস্থাপন করবেন নেতানিয়াহু। আগের ভাষণগুলোর মতো এবারো তিনি বিভিন্ন তথ্যচিত্র বা ডায়াগ্রাম প্রদর্শন করতে পারেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছেন এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে ট্রাম্প কথা বলেছেন। বারম্যানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আবারো বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম ট্রাম্পের। হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অসম্মতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সময়সূচির ওপর ভিত্তি করে তেহরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলেও তিনি মনে করেন।
জাতিসঙ্ঘের আগের সফরগুলোতে বিশ্বনেতাদের সাথে যেভাবে একের পর এক দ্বিপীয় বৈঠক করতেন নেতানিয়াহু, এবার তার নিউ ইয়র্কের সফরসূচিতে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। এই বিশ্লেষণ প্রকাশের সময় পর্যন্ত নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় অংশ নিতে ইসরাইলে ফেরার আগে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনা দেখা যায়নি। আগের সফরগুলোতে ভাষণের আগে-পরে বেশ কয়েক দিন সময় কাটিয়ে আন্তর্জাতিক নেতাদের সাথে বৈঠক করতেন নেতানিয়াহু। তবে এবারের সূচি অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার ভাষণের ঠিক আগে তিনি পৌঁছাবেন এবং ভাষণ শেষেই দ্রুত ফিরে যাবেন। বিশ্বনেতাদের সাথে এই যোগাযোগের ঘাটতির পেছনে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট শরিকদের নানা কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়াকে দায়ী করেছেন বারম্যান। গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের চালানো ধ্বংসযজ্ঞ এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিউ ইয়র্কে ব্যাপক বিােভের আশঙ্কার মধ্যেই নেতানিয়াহুর এই সংপ্তি সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ এবং ‘ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে অভিহিত করার পরদিনই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরের জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় কর্তৃপরে প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছিলেন মামদানি।