লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজস্ব বাড়াতে হবে ৪৭ শতাংশ

শাহ আলম নূর

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাড়ছে দ্রুত; কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের মতো বিস্তৃত ও কার্যকর করজাল এখনো তৈরি হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখে দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২৫-২৬ করবর্ষে রিটার্ন দিয়েছেন মাত্র ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার জন- অর্থাৎ নিবন্ধিত টিআইএনধারীর প্রায় ৬২ শতাংশই রিটার্ন দাখিল করেননি। রিটার্ন দাখিলের হার নেমে এসেছে প্রায় ৩৮ শতাংশে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। 
অন্য দিকে নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য আরো বড়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআর-নিয়ন্ত্রিত কর থেকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় এবার প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি রাজস্ব তুলতে হবে।  
গত অর্থবছরের ফলাফলই এই লক্ষ্যের কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট করে। সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি হয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। আয়কর থেকে এসেছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি, ভ্যাট এক লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি এবং শুল্ক থেকে এসেছে প্রায় এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা।  এনবিআরের জুন পর্যন্ত সাময়িক হিসাবে অবশ্য মোট আদায় চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। 
সমস্যার গভীরতা শুধু টিআইএন ও রিটার্নের ব্যবধানেই নয়। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআরের ডাটাবেজে বিপুলসংখ্যক নিষ্ক্রিয় টিআইএন রয়েছে- কারও ব্যবসা বন্ধ, কারও আয় করযোগ্য সীমার নিচে, আবার অনেকে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য টিআইএন নিয়েছেন। ফলে এক কোটি ৩০ লাখ টিআইএনকে সক্রিয় করদাতার   সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করলে করজালের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। একই প্রবণতা করপোরেট খাতেও। প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার করপোরেট টিআইএনের বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিটার্ন দিয়েছে প্রায় ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান। 
তবে রিটার্ন কমলেও আয়কর আদায় বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর আদায় প্রায় এক লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, আগের বছরের এক লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এর অর্থ, রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বেচ্ছায় আয় ঘোষণা করে কর দেয়ার চেয়ে উৎসে কর ও অগ্রিম করের ওপর নির্ভরতা এখনো প্রবল। 
কর ফাঁকির চিত্র আরো বড়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশে কর ফাঁকি ও কর পরিহারের কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি প্রায় দুই লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা অনুমান করা হয়েছে। গবেষণাটির পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতাও গবেষণায় স্বীকার করা হয়েছে। 
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন করহার বাড়ানো নয়, বিদ্যমান করজালের ফাঁক কতটা বন্ধ করা যাবে। নিষ্ক্রিয় টিআইএন বাদ দিয়ে সক্রিয় করদাতার ডাটাবেজ, ব্যাংক হিসাব-আমদানি-রফতানি-ভ্যাট-আয়করের তথ্য আন্তঃসংযোগ, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং কর ফাঁকি শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এনবিআর ইতোমধ্যে ই-রিটার্ন চালু করেছে এবং ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থাও কার্যকর করেছে। 
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- গত অর্থবছরের ঘাটতি কাটিয়ে এক লাফে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও ভোগে বড় ধরনের গতি না এলে শুধু একই করদাতার ওপর চাপ বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেছেন, বিদ্যমান কর ব্যবস্থার পদক্ষেপ দিয়ে বড় লক্ষ্য অর্জন কঠিন; কর ফাঁকি কমানোই কার্যকর পথ। তার মতে, বড় করদাতারা অবশ্য রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে আছেন। এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট- এলটিইউর অধিক্ষেত্রে বর্তমানে এক হাজার ১৫৯ করদাতা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক, বীমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক, মোবাইল ফোন কোম্পানি এবং কিছু বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অতএব, নতুন করদাতা শনাক্তের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রকৃত করদাতা শনাক্ত করা। কাগজে এক কোটি ৩০ লাখ টিআইএন থাকলেই করজাল বড় হয় না; নিয়মিত রিটার্ন, প্রকৃত আয় প্রকাশ এবং ন্যায্য কর পরিশোধের সংস্কৃতি তৈরি হলেই তার প্রতিফলন রাজস্বে দেখা যাবে। ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য সেই সক্ষমতারই বড় পরীক্ষা।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান অবশ্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে কাঠামোগত সমস্যার সাথে দেখছেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা এনবিআর রাজস্ব লক্ষ্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং ভোক্তা চাহিদার দুর্বলতার মধ্যে রাজস্বে বড় লাফ দেয়া সহজ নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্যাটি শুধু লক্ষ্যমাত্রার নয়; রাজস্ব আহরণের কাঠামোতেই পরিবর্তন প্রয়োজন।
ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, আমদানি-রফতানি, ভ্যাট ও আয়কর- এসব তথ্য যদি একই ডাটাবেজে কার্যকরভাবে যুক্ত না থাকে, তাহলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীদের ওপর অডিট ও কাগজপত্রের চাপও বাড়ে। ফলে কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর শুধু রিটার্ন অনলাইনে নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তথ্য বিশ্লেষণ ও আন্তঃসংযোগের পর্যায়ে নিতে হবে।