
আনাদোলু ও আলজাজিরা
গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনুসে ইসরাইলি বিমান হামলায় মুহাম্মদ নাসের সুলেইমান আল-বায়ুক নিহত হয়েছেন। বুধবার তার নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য সূত্র।
সূত্রগুলো জানায়, খান ইউনুসের দক্ষিণের বাতন আল-সামিন এলাকায় ওই হামলা চালানো হয়। একই সময়ে শহরের পূর্বাঞ্চলের আল-মেজবাহা এলাকায় ইসরাইলি গোলাবর্ষণে কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হন। হামেদ সিটির কাছে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতেও এক বয়স্ক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। খান ইউনুসের কেন্দ্রীয় এলাকায় দিয়ান আল-নাজ্জার ও আবু হামিদ মোড়ের আশপাশে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও কয়েকজন আহত হন। এ ছাড়া রাফাহ গ্যারেজ এলাকা এবং নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের আশপাশে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর লক্ষ্য করে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ দিকে গত বছর ইসরাইলি হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা বনি সুহেইলা শহরের সাইদ বারহেমও হাসপাতালে মারা গেছেন।
মধ্য ও উত্তর গাজাতেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। জাবালিয়া, বুরেইজ ও নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও তাঁবুতে ইসরাইলি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। জাবালিয়ায় গোলাবর্ষণে এক নারী গুরুতর আহত হন। বুরেইজ ও নুসেইরাতে গুলিতে আহত হয়েছেন আরো দুই নারী। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ৩৮৬ জন নিহত ও চার হাজার ৭৮৪ জন আহত হয়েছেন।
বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
অধিকৃত পশ্চিমতীরের নাবলুসের দক্ষিণে বেইতা শহরের আবু আল-হামরা এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, হামলাকারীরা একটি শিল্প স্থাপনা ও কৃষক সামের আবু মাজেনের একটি গোয়ালঘরে হামলা চালায়।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াফা ও আলজাজিরা জানায়, একদল বসতি স্থাপনকারী ওই এলাকায় হামলার সময় সরাসরি গুলি ছোড়ে। তবে এতে কেউ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এ দিকে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ পশ্চিমতীরের বসতি সম্প্রসারণের নীতি দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলেও ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি কথিত গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। স্মোত্রিচ পশ্চিমতীরকে বোঝাতে ‘জুদিয়া ও সামারিয়া’ এবং দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল বোঝাতে ‘গ্যালিলি’ ও ‘নেগেভ’ শব্দ ব্যবহার করেন।
আরো ১২ লাশ উদ্ধার
গাজা সিটির আল-তাজ স্কয়ার এলাকায় ধ্বংস হওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে আরো ১২ ফিলিস্তিনির লাশ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে ফিলিস্তিনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। এ নিয়ে ওই এলাকায় উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা বেড়ে ৭৫ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, গাজা গভর্নরেটের উদ্ধারকারী দল একটি মিসরীয় কমিটির সহযোগিতায় ইয়র্মুক এলাকায় ধ্বংস হওয়া বাড়িগুলোর নিচে টানা ১২তম দিনের মতো তল্লাশি চালিয়েছে। নিখোঁজদের লাশ উদ্ধারে গত ১৯ জুলাই শুরু হওয়া ‘শহীদদের লাশ উদ্ধারের’ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে এ অভিযান চলছে।
দ্বিতীয় ধাপে গাজা, উত্তর গাজা ও মধ্য গাজার বিভিন্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এ কাজে ৮০০ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের আগের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৭টি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির নিচে প্রায় এক হাজার ৭২ জনের লাশ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রথম ধাপে প্রায় ৩৩৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। গাজা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ভারী সরঞ্জামের সঙ্কটে ধীরগতিতে চলছে উদ্ধারকাজ।
বৃষ্টিতে তাঁবুতে থাকা ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ
গাজায় মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতে ইসরাইলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁবুতে আশ্রয় নেয়া হাজারো ফিলিস্তিনির দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। ফিলিস্তিনি সূত্রের দাবি, ইসরাইলি হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষজন তাঁবুতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন এলাকার বহু তাঁবু পানিতে তলিয়ে যায়। রাস্তাঘাট কাদায় পরিণত হওয়ায় চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি থেকে তাঁবু রক্ষায় ফিলিস্তিনিরা পাওয়া যায় এমন বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে তাঁবুর উপর অতিরিক্ত আচ্ছাদন দেয়ার চেষ্টা করেন। প্রায় তিন বছর ধরে আবাসন ও উষ্ণতার সঙ্কটে থাকা গাজাবাসীর কাছে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। ইসরাইলের আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছাচ্ছে না। এমনকি কনটেইনারে তৈরি অস্থায়ী ঘরও গাজায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ছয়তলা একটি ভবন ধসে ২১ ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আটটি শিশু ছিল।







