
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে আবারো বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হবে কি না, তা নিয়ে ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নিয়ে তিনি শিগগিরই একটি ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে পারেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
অ্যাক্সিওসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত আসছে। আমি কি ইরানে গিয়ে তাদের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবো, নাকি দেবো না? এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত। আমার ক্ষেত্রে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।’
আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের নেতাদের সাথে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের। তিনি বলেন, সঙ্ঘাত নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান এবং তারা পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী দেখতে চায়, তা সরাসরি জানতে চান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানতে চাই তারা কোথায় আছে এবং কেমন করছে। আমরা তাদের ব্যাপারে খুবই সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করেছি।’ অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেবে নাকি সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পথে হাঁটবে, সে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করতে হলে ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সাথেও সমন্বয় করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নাকি পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাননি ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘ দিন ধরে চলতে পারে না। তাদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, ইরানের সাথে কোনো সমঝোতা না হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প আবারো বড় সামরিক অভিযানের পথ বেছে নিতে পারেন। অ্যাক্সিওসের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত আগস্টের শুরুতে সৌদি আরব ও কাতার উদ্বেগ প্রকাশ করায় ট্রাম্প বড় ধরনের হামলা আবার শুরু করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। এরপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের সাথে আলোচনা স্থগিত রেখেছে, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ওই কৌশলগত জলপথ দিয়ে তেল পরিবহন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে তা এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় কম। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
এ দিকে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক উপস্থিতি চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। অ্যাক্সিওসকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পূর্ণমাত্রার সঙ্ঘাতে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবেই এই অবস্থান ধরে রাখা হচ্ছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, সঙ্ঘাতের বিষয়ে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হবে, তা একসময় নির্ধারণ করতেই হবে। কারণ বর্তমান সামরিক অবস্থান অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প আরো বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে বলে তিনি সন্তুষ্ট। পাশাপাশি তেহরান এখনো ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
অন্য দিকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জন্যও একটি নতুন কৌশল তৈরি করছে হোয়াইট হাউজ। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হবে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একই সাথে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া। পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সঙ্ঘাত শেষ হওয়ার পর এবং ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এটি ব্যবহার করা হতে পারে। আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক সফরের সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হতে পারে।’
হরমুজে তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলা
হরমুজ প্রণালীতে টোগোর পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির অভিযোগ, ‘অবৈধভাবে’ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ অতিক্রমের চেষ্টা করায় জাহাজটিতে আঘাত করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত বিবৃতির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানায়, ‘ট্রেন্ড’ নামের ওই ট্যাংকারটি গত বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাদের দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্ররোচনা ও প্রতারণায় পড়ে জাহাজটি অনুমোদনহীন পথে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনীর ভাষ্য, জাহাজটি অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় আগুন ধরে যায় এবং পরে সেটিতে আঘাত করা হয়। এরপর জাহাজটির চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) গত বৃহস্পতিবার জানায়, হরমুজ প্রণালীতে একটি ‘নিরাপত্তাজনিত ঘটনা’ ঘটেছে। ঘটনাস্থলটি ওমানের খাসাব শহর থেকে ১৬ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে। তবে ইউকেএমটিও এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। ফলে আইআরজিসির যে জাহাজের কথা বলেছে, সেটিই ওই জাহাজ কি না- তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে আইআরজিসি নৌবাহিনী আরো দাবি করেছে, তাদের নৌসেনারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তারা যেসব শক্তিকে ‘আগ্রাসী’ হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের যেকোনো তৎপরতা ঠেকানোরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
জাহাজের মালিক ও নাবিকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে ইরানের নৌবাহিনী বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে অনুমোদনহীন পথে চলাচলের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ধ্বংস ছাড়া অন্য কোনো ফল হবে না। এ দিকে হরমুজে গতকাল ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতে একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউকেএমটিও জানায়, আঘাতের ফলে ট্যাংকারে আগুন ধরে গিয়েছিল। ইতোমধ্যেই আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ট্যাংকারের সব কর্মী নিরাপদ আছেন বলে জানা গেছে। পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়েছে কি না- তা বর্তমানে নিশ্চিত নয়। সংস্থাটি ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, তদন্ত চলাকালে কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ নজরে এলে তা যেন ইউকেএমটিও-কে জানানো হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।







