এল নিনোর প্রভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে পারে বোরো উৎপাদন

হামিম উল কবির 

সামনের বোরো মৌসুমে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বোরো চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেড়ে যেতে পারে দেশের গড় তাপমাত্রা। আবার একই সাথে কমে যেতে পারে বৃষ্টিপাতও। শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রার বাড়ার প্রভাবে বাড়তে পারে সেচের চাহিদা। বাড়তি পানি সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর চাপ বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বোরো মৌসুমের ধানের ফলন চাহিদা মতো উৎপাদন না হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তবে এল নিনোর প্রভাবের সাথে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাংলাদেশে আগামী কয়েক মাসের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার প্রকৃত পরিস্থিতির ওপরও উৎপাদন অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।    
ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইআরআই) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এল নিনো অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরের নিনো ৩.৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্য দিকে কিছু পূর্বাভাসে চলতি বছরের শেষের দিকে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার হওয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির এডজাঙ্কট প্রফেসর জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী। 
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের কৃষ্টির জন্য তাপমাত্রার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপুর্ণ। বোরো ধান সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে রোপণ করা হয় এবং পরের এপ্রিল-মাসে মাড়াই করা হয়। এ সময়ের মধ্যে বোরোর মৌসুম বলে বোরো চাষে বৃষ্টির পানির পরিবর্তে সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। অতীতের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর বছরে বাংলাদেশের বোরো মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে কৃষকদের সেচের  ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেন। এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা কমে গেলে ফসলিজমি ও গাছ থেকে পানির বাষ্পীভবন বেড়ে যায়। মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করে ভালো ফলন পেতে কৃষকরা তখন সেচ দিতে থাকেন। এর ফলে পানি ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও যথেষ্ট চাপ পড়ে। অর্থনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হলে সময়মতো সেচ দিতে না পেরে অনেক কৃষকের বোরোর ফলন কমে যায়। 
এটি ঠিক যে আমন ধান ফলনের চেয়ে বোরো ধান উৎপাদনে সেচের ওপর কম নির্ভর করে কৃষক। ওই সময় ভূর্গভের ও ভূউপরিস্থিত পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে এবং কৃষককে সময়মতো সহজে বিদ্যুৎ, ডিজেল ও সার সরবরাহ করতে পারে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য ফলনহানি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে করেন ড. রাশেদ চৌধুরী। 
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘এল নিনোর কারণে বোরো উৎপাদন কমবে’ হিসেবে দেখার চেয়ে বোরো উৎপাদন কমে যাওয়ার বাড়তি ঝুঁকি হিসেবেই দেখা উচিত। আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পূর্বাভাস থেকে উৎপাদন ঝুঁকি নির্ণয় করে তা থেকে উত্তরণের উপায় এখনই বের করার আহ্বান জানান ড. রাশেদ চৌধুরী। 
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বোরো ধানের গুরুত্ব অনেক বেশি। বছরে প্রায় দুই কোটি দুই লাখ টন বোরো ধান উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদন দেশের মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি। ফলে বোরো উৎপাদনে সামান্য ঘাটতিও জাতীয় পর্যায়ে চালের প্রাপ্যতা ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।   
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় আগেভাগেই সেচের পানির প্রাপ্যতা, ভূগর্ভের পানির স্তর, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ডিজেলের প্রাপ্যতা পর্যবেক্ষণ করে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে এল প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোকে কেন্দ্র বোরো উৎপাদনে ঝুঁকি বাড়লে তা এখনো নিশ্চিত উৎপাদন হ্রাসের পূর্বাভাস নয়। আবহাওয়ার পরিস্থিতি, পানির প্রাপ্যতা ও কৃষকদের সেচ সুবিধাই শেষ পর্যন্ত এই ঝুঁকি কত দেখা দেবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।