৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার নোটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পদ কোথায়?

বিশেষ সংবাদদাতা 

দেশের অর্থনীতিতে প্রচলিত ব্যাংক নোটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু ডিপার্টমেন্টের (ওংংঁব উবঢ়ধৎঃসবহঃ) হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ, রৌপ্য, সরকারি সিকিউরিটিজ ও বাণিজ্যিক কাগজপত্রসহ পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে। ২৩ জুলাই সমাপ্ত সপ্তাহের হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিভাগের মোট দায় ও সম্পদ সমান- তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। 
একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের (ইধহশরহম উবঢ়ধৎঃসবহঃ) মোট সম্পদ ও দায় দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৬ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেনাদার ব্যালান্সই এক লাখ ১৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা এই বিভাগের মোট সম্পদের প্রায় ২৭.৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৮ জুলাই তারিখে স্বাক্ষরিত সাপ্তাহিক বিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 
১. নোট ইস্যুর বিপরীতে ৩ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা
ইস্যু ডিপার্টমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, ২৩ জুলাই পর্যন্ত প্রচলনে থাকা মোট নোটের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। 
এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা- তিন লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ প্রচলিত নোটের প্রায় ৮৬.১ শতাংশেরই প্রতিনিধিত্ব করছে বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ। অন্যান্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে :
* স্বর্ণমুদ্রা ও বুলিয়ন : ৪,২৯১.৯৯ কোটি টাকা (মাত্র ১.১৭ শতাংশ)  ক্স রৌপ্য: প্রায় ১২১.৯ কোটি টাকা
* বাংলাদেশ সরকারের সিকিউরিটিজ : ৪৩,২৭৬.০৯ কোটি টাকা (এর মধ্যে স্বাধীনতার পর নোট ইস্যুর বিপরীতে তৈরি বিশেষ ধফ যড়প ঞৎবধংঁৎু ইরষষং-ও অন্তর্ভুক্ত)
* অভ্যন্তরীণ বিল অব এক্সচেঞ্জ ও বাণিজ্যিক কাগজপত্র : প্রায় ২,৯৮৭.৯৪ কোটি টাকা 
* অন্যান্য খাতে সামান্য কিছু সম্পদ।
২. সরকারের দেনা ও ব্যাংকিং খাতের আমানত
ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের ২৩ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, এর মোট সম্পদ ও দায় চার লাখ ২৬ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে সরকারের আর্থিক লেনদেন :
* সরকারের দেনাদার ব্যালান্স : এক লাখ ১৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকা (মোট সম্পদের ২৭.৭%)। 
* সরকারের কাছে ঋণ ও অগ্রিম : ৮,২৬৬.৫২ কোটি টাকা। 
আমানতের চিত্র :
এই ডিপার্টমেন্টের দায়ে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জমা রয়েছে ৯৫,৫৪৭.৫৬ কোটি টাকা। অন্য দিকে সরকারের জমা মাত্র ৫০৮.১০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য আমানতকারীর জমা ২২,৫২৬.৮২ কোটি টাকা; অর্থাৎ মোট এক লাখ ১৮ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার আমানতের প্রায় ৮০.৬ শতাংশই এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। 
৩. বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সম্পদ 
ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের সম্পদের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাত :
* বিনিয়োগ : এক লাখ ১০,৭০৪.৩১ কোটি টাকা (মোট সম্পদের প্রায় ২৬%)। 
* অন্যান্য সম্পদ : এক লাখ ৪৮,৮৮৬.২ কোটি টাকা (প্রায় ৩৪.৯%)। 
* দেশের বাইরে ব্যালান্স ও সিকিউরিটিজ : ৬৬,১১৭.৪৩ কোটি টাকা। 
* আইএমএফের এসডিআর : ১৭,০৩২.২০ কোটি টাকা। 
৪. নোট ছাপানো মানেই সম্পদ সৃষ্টি নয় 
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই হিসাব থেকে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্রচলনে থাকা নোট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট সম্পদ একই বিষয় নয়। ইস্যু ডিপার্টমেন্ট নোটের বিপরীতে নির্দিষ্ট সম্পদ দেখায়, আর ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টে আমানত, ঋণ ও বিনিয়োগের হিসাব থাকে। 
ফলে তিন লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার নোট প্রচলনে রয়েছে- এটিকে সরাসরি ‘সরকারের জন্য টাকা ছাপানো হয়েছে’ বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হিসাবগতভাবে সঠিক নয়; বরং দেখা জরুরি এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা বা সিকিউরিটিজের প্রকৃত অনুপাত কত। এ ছাড়া বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থায় স্বর্ণের ভূমিকা সামান্য (১.১৭ শতাংশ), যার মূল ভিত্তি এখন বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদ। 
৫. বড় প্রশ্ন এখন সম্পদের মান নিয়ে 
২৩ জুলাইয়ের হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেবল অঙ্ক নয়, বরং সম্পদের গুণগতমান ও তারল্য। বিশ্লেষকদের মতে, সামনে তিনটি প্রধান প্রশ্ন রয়েছে :
১. প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার ‘ঙঃযবৎ অংংবঃং’ বা অন্যান্য সম্পদের প্রকৃত প্রকৃতি ও মান কী? 
২. এক লাখ ১০ হাজার ৭০৪ কোটি টাকার বিনিয়োগের কত অংশ সরকারি সিকিউরিটিজ এবং সেগুলোর বাজারমূল্য বা মেয়াদ কত? 
৩. সরকারের কাছে থাকা প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার দেনাদার ব্যালান্স আদায় বা নিষ্পত্তির দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো কী? 
এসব বিষয় স্পষ্ট না হলে কেবল ব্যালান্সশিটের মোট আকার দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য বা ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। 
কেন এই হিসাব এত গুরুত্বপূর্ণ? 
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বহুমুখী আলোচনার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাপ্তাহিক ব্যালান্সশিট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুদ্রা ইস্যু করা থেকে শুরু করে সরকারের অর্থায়ন, ব্যাংকিং তারল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা- সব কিছুরই একটি স্বচ্ছ দর্পণ হলো এই সাপ্তাহিক আর্থিক বিবরণী।