
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি তাদের আগের মেয়াদ, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সাহস থাকলে ওই সময়ের দুর্নীতি ও অভিযোগগুলোর তদন্ত করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এনসিপি আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এ কথা বলেন। ‘বিএনপি সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক আইন পাস, বিরোধী মত দমন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে’ এ কর্মসূচির আয়োজন করে দলটি। এতে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) পুনর্গঠন করে এনসিপি ও বিরোধী দলকে টার্গেট করা হচ্ছে। যদি সাহস থাকে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুর্নীতি ও অভিযোগগুলো আপনারা তদন্ত করুন।’
মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার যে লড়াই হয়েছিল, সেই অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার এমন আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, যা মানবাধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, পাঁচ মাস ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, তাদের সরকারের সাত মাসে কোনো গুম হয়নি। মিরাজ শেখের পরিবারকে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, পরিবার থানায় গেলে প্রথমে মামলা নেয়া হয়নি এবং পরে জিডি নেয়া হলেও সেখানে কোস্টগার্ডের নাম লিখতে দেয়া হয়নি। গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর ও গাজীপুরের সিফাতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়ার সমালোচনা করেন নাহিদ। তিনি বলেন, খারাপ ভাষা ব্যবহারের ঘটনায় গাজী সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল; কিন্তু তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গালি দেয়া বা মিম করাকে সন্ত্রাস হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন নাহিদ। হবিগঞ্জে ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জে দেখেছেন, আমাদের ছাত্রশক্তির কিশোর আলিফের চোখ তারা কেড়ে নিয়েছে। বিরোধী দল-মত দমন করা শুরু হয়ে গেছে।’
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়েও আপত্তি জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই করা হয়, তাহলে একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য একটি বাহিনী তদন্ত করবে। অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে শাস্তির বিধান থাকলে মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী অতীতে গুম হয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ইলিয়াস আলীর গুমের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি বিরোধী দলে থাকার সময় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। এখন সরকারে এসে তারা জাতীয় পর্যায়েও কোনো তদন্ত হতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মানবাধিকার কমিশনকে ‘সরকারি মানবাধিকার কমিশনে’ পরিণত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ। গুমের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। জাতিসঙ্ঘ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বানও জানান নাহিদ ইসলাম। একই সাথে জাতীয় ঐক্য প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশ সংস্কার কমিশন না করে পুলিশকে বিরোধী দল দমনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনকেও দুর্বল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। একই সাথে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সুশাসন দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন এবং প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনে নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে এসব বিষয়ে সমাধান না হলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে ফয়সালা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। গুম আইনের সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন বলেন, গুমের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং তদন্তকারী সংস্থার জবাবদিহি যথাযথভাবে আইনে রাখা হয়নি। সাইবার সিকিউরিটি আইনেও প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
র্যাবের পরিবর্তে নতুন বাহিনী গঠনের সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তার ভাষ্য, র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশের পরও নতুন নামে একই ধরনের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সংবাদকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সংবাদ পরিবর্তন বা সরিয়ে নেয়ার জন্য ফোন দেয়ার অভিযোগ করেন তিনি।







