ইরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি, উপসাগরীয় দেশগুলো,
২৬ অক্টোবর তেহরানে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদের সাথে বৈঠকের পূর্বে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে ইরানের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার আশঙ্কা এবং ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হাউছিদের সাথে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হওয়ায় এ উদ্যোগ আরো গুরুত্ব পেয়েছে।

Advertisement

আল জাজিরা বুধবার (২৮ অক্টোবর) জানায়, সর্বাত্মক যুদ্ধ আবারো শুরু হওয়া ঠেকাতে সোমবার তেহরানে ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা। গত আগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করা এই তিন দেশের পাশাপাশি কাতারের কূটনীতিকেরাও বৈঠকে অংশ নেন।

 সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদের উপস্থিতি এই বৈঠকের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে ইরান-ঘনিষ্ঠ হাউছি যোদ্ধারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিলেন।

একই সময়ে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কূটনৈতিক সফরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইরানের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর প্রস্তাবে ছিল একটি ‘অনাক্রমণ চুক্তি’। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেরাই করবে।

উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে সংঘাত এড়াতে চাইলেও এ ধরনের চুক্তি আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে, বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

 আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নাকি উত্তেজনা প্রশমন?

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দেন। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইরান আরো জোরালো জবাব দেবে। এতে সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির দেশগুলোর সাথে ইরানের এ সপ্তাহের বৈঠকই ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা রোববার ইরানের কাছে একটি খসড়া চুক্তি তুলে দিয়েছেন। সপ্তাহের শেষ নাগাদ তেহরানের জবাব দেয়ার কথা। বুধবার রয়টার্সকে ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, কাতারের দেয়া প্রস্তাবগুলোর কিছু ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ খালেদ বাতারফি মনে করেন, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তেহরান সফরের মধ্য দিয়ে ইরানকে শেষবারের মতো সতর্ক করার এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগ মেনে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইরান এখন পর্যন্ত তা গ্রহণ করেনি।

আল জাজিরাকে বাতারফি বলেন, ‘দুই পক্ষের ব্যবধান অনেক। আর আস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে।’

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক আনিসেহ বাসিরি তাবরিজিও মনে করেন, মতপার্থক্যের কারণে বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগ থেকে স্থায়ী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম।

তাঁর ভাষায়, ‘আগামী কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরের মধ্যেও একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠবে—এমনটা কল্পনা করাও কঠিন।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ ছোট ও নমনীয় জোটের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু একটি স্থায়ী কাঠামো গড়তে হলে পুরো অঞ্চল নিয়ে দেশগুলোর অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি  উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদের মধ্যেও নেই।

সামনে বড় বাধা

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পুরো অঞ্চলকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।  পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের এ বিষয় অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।

তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রতিশ্রুতি পালনের ধারাবাহিকতা নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্যই প্রধান বাধা বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের কাছ থেকে, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে, ছাড় চায়। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, যুদ্ধ শেষ করার জন্য তাদের শর্তগুলো আগে পূরণ করতে হবে।

আজিজি বলেন, আঞ্চলিক মধ্যস্থতা এই ব্যবধান কমাতে পারে। অন্তর্বর্তী কোনো সমঝোতার পথও খুলতে পারে। কিন্তু আঞ্চলিক দেশগুলো সমঝোতা করাতে আগ্রহী হলেই যে মূল দুই পক্ষ প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবে, তা নয়।

নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন হবে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী থাকবে, তা নিয়েও দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। এত দিন জিসিসির দেশগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার পক্ষে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এ সম্পর্ক ছেড়ে দেয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

আজিজির মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্য, সে প্রশ্ন তুলেছে ঠিকই। তবে এতে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের কৌশলগত অবস্থান আমূল বদলানোর বদলে অন্য দেশগুলোর সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।