বোমার জননী, ইরান,  ক্ষেপণাস্ত্রের জনক,  যুদ্ধ কি ঘনিয়ে এলো,  যুক্তরাষ্ট্র,  হুঁশিয়ারি, হামলা হলে জবাব, তেহরান, ওয়াশিংটন
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। দাম নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর কথা বলে ইরানকে হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সাথে নতুন করে সংঘাত শুরুর বেশ কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে।

Advertisement

ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানা শনিবার (১৭ অক্টোবর) জানায়, ইরাকের আকাশে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের চলাচল, ইরানের সীমান্তের কাছে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের টহল এবং ইসরাইলে বোমা আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়ার খবর উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে। আগের রাতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আকাশসীমাও খালি করে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই বাড়ছে।

গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘বোমার জননী’ ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। এর জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি বলেছেন, ইরান পাল্টা জবাব দিতে পারে ‘ক্ষেপণাস্ত্রের জনক’ দিয়ে। ওয়ানার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর এই মন্তব্য নিছক ব্যঙ্গাত্মক জবাব, নাকি এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি ইসরাইলের মোকাবেলায় নিজেদের সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে ইরান।

একই প্রসঙ্গে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর রসদ বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়েদ মাজিদ ইবন আল-রেজা সরাসরি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বোমার নাম বা আকার কোনো বিষয় নয়! তোমাদের বোমার খেসারত দিতে হবে তোমাদেরই, বিশ্বে তোমাদের অবস্থান, মার্কিন অর্থনীতি, এমনকি মার্কিন নির্বাচনী হিসাব-নিকাশেও!

ইবন আল-রেজা আরো বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুদ্ধের হিসাব বদলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের এখনই বলা উচিত, ‘জি, জনাব!’

তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, যুদ্ধে শক্তির বিচার শুধু বোমার আকার বা ধ্বংসক্ষমতা দিয়ে করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শক্তিশালী অস্ত্র থাকলেও হামলার পরিণতি, ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও হিসাবের আওতায় রাখতে হবে।

ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কা এরই মধ্যে বেড়েছে। কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, আলোচনা অচলাবস্থায় পড়া, মার্কিন চাপ মোকাবেলায় ইরানের সক্ষমতা এবং তেলের দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুতর। ইরানও হুমকিগুলোকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। দেশটি সামরিক প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়ে বলেছে, হামলা হলে জবাব দেয়া হবে। প্রতিপক্ষ ‘বোমার জননী’ নিয়ে আসুক কিংবা অন্য কোনো অস্ত্র, তাতে এই অবস্থানের পরিবর্তন হবে না।

‘বোমার জননী’ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সবচেয়ে বড় প্রচলিত, অ-পারমাণবিক বোমাগুলোর একটি। তবে কোনো অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতাই এককভাবে যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে না। এর ধ্বংসক্ষমতাকে পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তির সমান ভাবা যায় না। আবার এমন অস্ত্র ব্যবহারের কৌশলগত পরিণতিও আলাদা।

এদিকে, কুহে কলাংয়ে হামলার জবাবে ইরান যেন পাল্টা আঘাত না হানে, সে জন্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ জানিয়েছে বলে খবর এসেছে। এতে সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেয়া হবে। খবরটি সঠিক হলে বোঝা যায়, সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রেখে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন। কারণ, সংকট দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

ট্রাম্পের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, সংঘাত বাড়িয়ে তিনি যে লক্ষ্য অর্জন করতে চান, তা আদৌ সম্ভব হবে কি না। নাকি এতে জ্বালানির দাম আরো বাড়বে এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে? ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও যেকোনো হামলার আঞ্চলিক পরিণতিকে হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ নেই।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কী অস্ত্র আছে, কিংবা ইরান কীভাবে জবাব দেবে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, নিজের ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আরো বড় বোঝা না চাপিয়ে ওয়াশিংটন তার লক্ষ্য হাসিল করতে পারবে কি না।

সামরিক হুমকি চাপ বাড়াতে পারে। কিন্তু তাতে রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিণতি যুদ্ধ শুরু করা পক্ষের হিসাব-নিকাশের বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।