
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হাউছিদের হামলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা হিসেবে ‘আকাশপথে প্রতিরক্ষামূলক জ্বালানি সরবরাহ’ করবে যুক্তরাজ্য।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে সাইপ্রাসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স আক্রোতিরি (আরএএফ) ঘাঁটিতে থাকা একমাত্র ভয়েজার বিমানটি অংশ নেবে বলে জানা যাচ্ছে।
সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে ‘সামরিক সহায়তার’ অনুরোধ আসার পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ডের পরামর্শে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম।
সামরিক সহায়তার প্রস্তাবটি ‘একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য’, প্রাথমিকভাবে যা ‘কয়েক সপ্তাহ’ স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা।
হাউছিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সাথে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইয়েমেনের বর্তমান সরকারের প্রতি সৌদি আরবেরও সমর্থন রয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ছাড়াও লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে হাউছিরা।
যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা বলছেন, সৌদি সরকার যেন আগামীতে ওই ধরনের হামলা প্রতিহত করতে পারে, সেজন্য তারা সৌদি বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করবেন।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে থাকা যে একক ভয়েজার বিমানটি ওই কাজে ব্যবহার হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে, সেটি রয়্যাল এয়ার ফোর্সের তালিকাভুক্ত নয়টি বিমানের একটি।
মূল বহরে থাকা ওই নয়টি বিমানের মধ্যে আটটি সামরিকভাবে নিবন্ধিত এবং অন্যটি বেসামরিকভাবে নিবন্ধিত। এর বাইরে, সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার মতো ওই ধরনের আরো পাঁচটি বিমান আরএএফের কাছে আছে।
নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন বার্নহাম। সৌদি সরকারকে সামরিক সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্তটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ’ এবং ‘যুক্তরাজ্যের স্বার্থ’ মাথায় রেখেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এবং ব্রিটেন ও বৃহত্তর অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষার জন্য নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে আমি আমার করা আগের মন্তব্যে ফিরে যাচ্ছি।’
সামরিক সহায়তা প্রদানে সম্মত হওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন, সৌদি আরব ক্রমাগতভাবে হামলার শিকার হচ্ছে এবং বিশৃঙ্খলা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাজেই সেটি যেন না ঘটে, সেজন্য পথ খোলা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করে যুক্তরাজ্য।
যুক্তরাজ্যর প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম বলেন, ‘আর সেকারণেই আমরা এই অনুরোধে সম্মত হয়েছি।’
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। সেইসাথে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালীর পর এখন লোহিত সাগরেও জাহাজ চলাচলে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কিন্তু ওই নৌপথগুলো বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাউছিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্যও ওই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাউছিরা বলছে, তারা সৌদি জাহাজগুলো ওইপথ দিয়ে চলাচল করতে দেবে না।
একইসাথে, হাউছিরা সৌদি আরবে বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলাও চালাচ্ছে। একের পর এক চালানো ওইসব হামলা প্রতিহত করতে সৌদি রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে।
যদিও হামলার পাল্টা জবাব দেয়ার জন্য দেশটির কাছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের অফুরন্ত ভাণ্ডার মজুদ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এ অবস্থায় সৌদি আরব পাল্টা হামলা চালালে যুক্তরাজ্য তাদেরকে যে ধরনের সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে, সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনায় তা ‘বেশ নগণ্য’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
কেউ কেউ এই পদক্ষেপকে ‘বিপদে পড়া মিত্রের প্রতি একটি লোক দেখানো সৌজন্যতা’ হিসেবেও বর্ণনা করছেন।
তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা অবশ্য সেটি মনে করছেন না। তারা বলেছেন, পদক্ষেপটি সৌদি সরকারকে হামলার জবাব দিতে সহায়তা করবে।
তাদের ভাষায়, সহায়তাটি ‘সীমিত সময়ের’ জন্য, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে থেমে থেমে যুদ্ধ চলছে এবং এই সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
পরিস্থিতি এমন জটিল হয়ে ওঠার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে দেখা হচ্ছে।
হাউছিরা মূলত ইরানের সমর্থনপুষ্ট। এখন ইরান যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ সৌদি আরবের ওপরে হামলা চালাচ্ছে। এই হামলার আরেক কারণ সৌদি আরবের সাথে হাউছিদের সঙ্ঘাতের ইতিহাস রয়েছে।
এই সঙ্ঘাতে যুক্তরাজ্যের জড়িয়ে পড়া দেশটির নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে কি-না, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। যদিও ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, এক্ষেত্রে ঝুঁকি সীমিত।
সামরিক সহায়তা সৌদি সরকারের জন্য সুবিধাজনক হলেও ব্রিটেনের বেশিভাগ মানুষ এমন সিদ্ধান্তে খুব একটা খুশি হবে বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা।
এদিকে, গত সপ্তাহে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রতি তারাও সমর্থন দিতে পারেন।
মার্ক রুটে বলেন, ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে যদি এটি নিয়ে ফোনে কথা হয় যে, ‘আচ্ছা, আমরা এই পরিস্থিতিটা কিভাবে সামাল দেবো?’ তাহলে আমি অবাক হবো না।
তিনি যোগ করেন, ‘দেখা যাক কী হয়। ন্যাটোর যদি সাহায্য করার সুযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই করবে।’
এরপর গত সপ্তাহে ব্রিটিশ জ্বালানিমন্ত্রী মার্টিন ম্যাকক্লাস্কি পার্লামেন্টকে জানান, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে আকাশপথে তাদের বিমানবাহিনীকে প্রতিরক্ষা সহায়তা প্রদান করা হবে।
এর আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইয়েমেনে হাউছিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দিয়েছিল যুক্তরাজ্য।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছিলেন, রয়্যাল নেভির একটি যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন জাহাজকে লক্ষ্য করে হাউছিদের হামলা চালানোর পর যুক্তরাজ্য ‘আত্মরক্ষার্থে’ ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
জীবন ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঠিক রাখতে হাউছিদের ওপর চালানো হামলাকে ‘প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক এবং সুনির্দিষ্ট’ বলে বর্ণনা করেছিলেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি








