ধ্বংসস্তূপ, বায়ুকল, গাজা,  বেঁচে থাকার লড়াই, গাজা, বিদ্যুৎ,
গাজার বায়ুকল দিচ্ছে বিদ্যুৎ। এএফপি

যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন। আরবি ভাষায় এ প্রবাদের কাছাকাছি কোনো প্রবাদ আছে কি না, তা বলা মুশকিল। তবে এই প্রবাদের মর্ম যেন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন গাজার মানুষ। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হত্যাযজ্ঞের শিকার গাজার মানুষ আজ ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই খুঁজে নিচ্ছেন বেঁচে থাকার নতুন পথ।  ইসরাইলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদে জীবনকে একটু সহনীয় করে তুলতে তাঁরা খুঁজে নিচ্ছেন নতুন নতুন উপায়। চারদিকে ধ্বংস আর হতাশার মধ্যেও তাঁরা আবিষ্কার করছেন সৃষ্টির আনন্দ। চুরমার হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ ঘেঁটে কুড়িয়ে আনছেন পুরোনো মোটর, ধাতব পাত, তার ও নানা যন্ত্রাংশ। সেসব জুড়ে তৈরি করছেন বায়ুকল। সাগরের বাতাসে ঘুরছে সেই বায়ুকলের পাখা, আর তা থেকেই মিলছে সামান্য বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎই এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।

Advertisement
কাজে ব্যস্ত কামাল আদ-দাবারি

 

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি ঘনবসতিপূর্ণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে এ উদ্যোগ নিয়েছেন কামাল আদ-দাবারি। একসময় প্রকৌশলবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি। এখন নিজের সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎহীন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। গাজার অধিকাংশ মানুষের মতো এসব পরিবারেরও বিধ্বস্ত বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার সাথে সরাসরি কোনো সংযোগ নেই।

Advertisement

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ গাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে ইসরাইলি হামলায়। এর বড় অংশই ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।

মাটিতে বসে একটি প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর বৈদ্যুতিক তার, ধাতব যন্ত্রাংশ ও সাধারণ কিছু সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করছিলেন আল-দাবারি। তারগুলো সতর্কতার সাথে জোড়া লাগিয়ে মাল্টিমিটার দিয়ে পরীক্ষা করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে একটি ছোট বাতি জ্বলে উঠল। এরপর জ্বলে উঠল আরেকটি। বোঝা গেল, বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়েছে।

৬০ বছর বয়সী আল-দাবারি ইসরাইল ও হামাসের যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের প্যানেলের দাম যখন তুলনামূলকভাবে নাগালের মধ্যে ছিল, তখন আমরা একটি কিনেছিলাম। সূর্যের অবস্থান অনুসারে সেটি বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে নিতাম।’

কিন্তু তিন বছরের যুদ্ধে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইসরাইলের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা সীমান্তপথ দিয়ে গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য খুব সীমিত পরিমাণে প্রবেশ করায় সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। আল-দাবারি জানান, এখন একটি সৌরবিদ্যুতের প্যানেলের দাম কমপক্ষে ১৫ হাজার শেকেল, যা প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের সমান। গাজার অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই এই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়।

‘তিন বছর ধরে আমাদের কোনো কাজ নেই, আয়ও নেই,’ বলেন তিনি।

বিদ্যুৎ দিচ্ছে বায়ুকল

 

এমন পরিস্থিতিতেই বাতাস থেকে বিদ্যুৎ তৈরির চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। আল-দাবারি বলেন, ‘তখন ভাবলাম, বাতাসকে কাজে লাগালে কেমন হয়? এরপর ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে শুরু করলাম।’

স্কুটারের মোটর এবং পুরোনো পানির ট্যাংক কেটে তৈরি করা হয়েছে এসব বায়ুকল। বাতাসে পাখা ঘুরলে মোটরও ঘোরে। সেখান থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি বর্তনীতে প্রবাহিত হয়। পরে তা ব্যাটারিতে জমা রাখা হয়।

এই বিদ্যুৎ দিয়ে মুঠোফোন চার্জ দেয়া, বাতি ও পাখা চালানো, এমনকি বৈদ্যুতিক শেভার ব্যবহার করাও সম্ভব হচ্ছে। তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোর কাছে একসময় সাধারণ বলে বিবেচিত এসব সুবিধাই এখন অনেকটা বিলাসিতার মতো।

যুদ্ধের সময় গাজার প্রায় সব বাসিন্দাই অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের অধিকাংশই হামাসের শাসনাধীন ভূখণ্ডের ছোট একটি এলাকায় বসবাস করছেন। অন্যদিকে, গাজার পরিধি বরাবর ৬০ শতাংশের বেশি ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইসরাইলের হাতে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আবু আয়মান নামে পরিচিত আল-দাবারি বলেন, ‘এগুলো আমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করছে। আল্লাহ যত দিন না এই দুর্দশা থেকে মুক্তি দেন এবং আমরা নিজেদের ঘরে ফিরতে পারি, তত দিন এগুলোই আমাদের ভরসা।’

এসব বায়ুকল থেকে অবশ্য খুব বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। কিন্তু যেখানে প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের অভাব, সেখানে সামান্য বিদ্যুতেরও অনেক মূল্য।

৫০ বছর বয়সী সালেহ বিন হাসান বলেন, ‘এ ব্যবস্থা আমাদের সবকিছু বদলে দিয়েছে।’

গাজায় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় এসব বায়ুকলের বিদ্যুৎ চিকিৎসার কাজেও লাগছে। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসার সরঞ্জাম চালু রাখতে তা সহায়তা করছে।

হাসান বলেন, ‘গভীর রাতে কোনো শিশুর যদি নেবুলাইজার দিয়ে ওষুধ নেয়ার প্রয়োজন হয়, তখন আমরা আর কার কাছে যাব? বিদ্যুৎ তো দরকার। তাই আমরা আমাদের ভাই আবু আয়মানের কাছে যাই।’

ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা পুরোনো যন্ত্রাংশে তৈরি এসব বায়ুকল হয়তো গাজার বিদ্যুৎ-সঙ্কট দূর করতে পারবে না। কিন্তু তাঁবুর অন্ধকারে একটি বাতি জ্বালাতে পারা, শিশুর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র চালু রাখা কিংবা মুঠোফোনে চার্জ দেয়ার সুযোগ তৈরি করাও সেখানে কম কিছু নয়। যে জনপদে যুদ্ধ মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে, সেখানকার মানুষ ধ্বংসের মধ্যেই বেঁচে থাকার উপকরণ খুঁজে নিচ্ছেন। বাতাসে ঘুরতে থাকা ছোট ছোট বায়ুকলগুলো তাই শুধু বিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্র নয়, গাজার মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়েরও একেকটি নিদর্শন।