আলঝেইমার-বয়স-চিকিৎসা
খেটে খাওয়া এ বয়সী মানুষ যেন আলঝেইমার মুক্ত জীবন লাভ করেন। সংগৃহীত

মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর সময়ের অপ্রতিরোধ্য ছাপ হলো ডিমেনশিয়া, যার সবচেয়ে পরিচিত রূপ আলঝেইমার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি ঝাপসা হতে পারে। পরিচিত মুখ অপরিচিত হয়ে যেতে পারে। একসময় নিজের চেনা জগতটিও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারে। এতকাল মনে করা হতো, এ রোগ মানেই চিকিৎসার সুযোগ নেই; আলঝেইমার মানেই ‘নিরাময় অযোগ্য’।

যেন একবার এই যাত্রা শুরু হলে সামনে শুধু একটিই পথ—ধীরে ধীরে স্মৃতি হারানো, চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাতে ছিল মূলত উপসর্গ সামলানোর উপায়। রোগের গতিপথ বদলে দেয়ার আশা ছিল খুবই ক্ষীণ।

কিন্তু বিজ্ঞান এবার অন্তত সেই অপ্রতিরোধ্য গতির সামনে দাঁড়াতে শুরু করেছে। রোগকে পুরোপুরি থামাতে না পারলেও তার অগ্রগতি ধীর করা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও রোগটির সূত্রপাতও পিছিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

এ রোগকে জয় করা যায়নি। নিরাময়ের পথও এখনো অনেক দূর। কিন্তু লড়াইয়ের ধরন বদলাতে শুরু করেছে। একসময় যেখানে প্রশ্ন ছিল, ‘রোগটি কি সারানো যাবে?’ এখন সেখানে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—রোগটিকে কি কিছুটা ধীর করা যায়? তার আগমন কি কিছুটা পিছিয়ে দেয়া যায়?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন বিশ্বজুড়ে চলছে শত শত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। আর সেখানেই আলঝেইমার গবেষণার গল্পে দেখা যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

২০২৬ সালের বিশ্ব আলঝেইমার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলঝেইমার রোগকে এখন আর সর্বজনীনভাবে ‘নিরাময় অযোগ্য’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে নতুন কিছু ওষুধ প্রাথমিক পর্যায়ের আলঝেইমারে রোগের অবনতি সামান্য ধীর করতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে এমন গবেষণার সংখ্যাও বাড়ছে, যা বলছে—কিছু ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার সূত্রপাত হয়তো বিলম্বিত করা, এমনকি প্রতিরোধ করাও সম্ভব।

বিশ্বজুড়ে এখন শত শত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সম্ভাব্য ওষুধ, নতুন রোগ নির্ণয় পদ্ধতি এবং জীবনযাপনের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা চলছে। লক্ষ্য একটাই—স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির অবনতিকে যতটা সম্ভব আগে শনাক্ত করা, চিকিৎসা করা কিংবা তার গতি ধীর করা।

এখনো আলঝেইমারের নিরাময় অনেক দূরের বিষয়। কিন্তু এবারের বিশ্ব আলঝেইমার প্রতিবেদনের ভাষায়, নিরাময়ের সম্ভাবনাটি ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বাস্তব বলে মনে হচ্ছে’।

প্রতিবেদনটির সহলেখক আলঝেইমার্স ডিজিজ ইন্টারন্যাশনালের পাশাপাশি রয়েছেন স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক পল গ্যালাঘার। আলঝেইমার্স ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল নিজেদের ‘ডিমেনশিয়ার বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচয় দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকা ডিমেনশিয়া বিষয়ক সংগঠনগুলোর একটি আন্তর্জাতিক ফেডারেশন এটি। ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ডিমেনশিয়া গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে সংগঠনটি।

এবারের প্রতিবেদনের নাম ‘ডিমেনশিয়া ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নতুন যুগ’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণা এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদনের লেখকেরা এই সময়কে ১৯৯০-এর দশকের ক্যানসার গবেষণার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তখন ক্যানসারের প্রথম দিকের চিকিৎসাগুলো নিখুঁত ছিল না। কিন্তু সেগুলোই পরে কার্যকর ওষুধের সমন্বয়, নির্দিষ্ট রোগীর উপযোগী চিকিৎসা এবং আগেভাগে চিকিৎসার পথ খুলে দিয়েছিল।

তবে এখনো পেনিসিলিন আবিষ্কার কিংবা হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে স্ট্যাটিন ওষুধের সাফল্যের মতো কোনো একক যুগান্তকারী অগ্রগতি আসেনি। বরং পরিবর্তনটা অনেক শান্ত। নিরাময় থেকে প্রতিরোধের দিকে, অণু থেকে জীবনযাপনের দিকে, অনিবার্যতা থেকে সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে গবেষণা।

বিশ্বের মানুষ যত বেশি দিন বাঁচছে, ডিমেনশিয়ার বোঝাও তত বাড়ছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ডিমেনশিয়ায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১৩ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছাতে পারে।

তাই রোগের সূত্রপাত সামান্য সময়ের জন্যও পিছিয়ে দিতে পারলে তার অর্থ হবে অনেক মানুষের জীবন থেকে ডিমেনশিয়ার ভার সরিয়ে দেয়া। রোগের শুরু যদি কিছুটা দেরিতে হয়, তাহলে এর অর্থ হতে পারে ভবিষ্যতে লাখ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ার প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত থাকতে পারবেন।

সম্প্রতি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে নতুন নির্দেশনাও দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। নতুন গবেষণা বলছে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তনযোগ্য ১৪টি ঝুঁকি মোকাবিলা করা গেলে ডিমেনশিয়ার ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘটনা সম্ভাব্যভাবে প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যেতে পারে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং উচ্চ কোলেস্টেরল।

আলঝেইমারের চিকিৎসায় নতুন ওষুধের আবির্ভাবও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডোনানেমাব ও লেকানেমাব—এই দুটি ওষুধ প্রথম পুরোপুরি অনুমোদিত চিকিৎসা, যেগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের আলঝেইমারের অগ্রগতি সামান্য ধীর করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে চিকিৎসার বড় অংশই ছিল রোগের উপসর্গ সামলানো; এই ওষুধগুলো দেখিয়েছে, রোগের গতিপথে সরাসরি প্রভাব ফেলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ডিমেনশিয়া ট্রায়ালস নেটওয়ার্কের পরিচালক ক্যাথ মামেরির ভাষায়, রোগীদের ওপর আরো বড় প্রভাব আশা করা হয়েছিল। কিন্তু এই ওষুধগুলো দেখিয়েছে, রোগের গতিপথ বদলানো সম্ভব। তাঁর কথায়, ‘এটাই ভিত্তি। এটি প্রথম ইট। আর এর ওপর এখনো অনেক কিছু নির্মাণের বাকি।’

অবশ্য সব গবেষক মনে করেন না যে ডোনানেমাব ও লেকানেমাব রোগীদের জন্য অর্থবহ সুফল এনে দেয়। সব রোগীর ক্ষেত্রে কিংবা মস্তিষ্কের সব অংশে ওষুধ দুটি একইভাবে কাজ করে বলেও মনে হয় না। তারপরও এই দুটি ওষুধের অনুমোদন ডিমেনশিয়া গবেষণায় একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। বদলে দিয়েছে এই রোগের চিকিৎসাবিজ্ঞান কত দূর যেতে পারে—সে সম্পর্কে প্রত্যাশাও।

গত এক দশকে ডিমেনশিয়ার জন্য পরীক্ষাধীন সম্ভাব্য ওষুধের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৯২টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ১৫৮টি সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে। শুধু এ বছরই তৃতীয় ধাপের আটটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল পাওয়ার কথা। এই ধাপের পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর চিকিৎসা প্রয়োগ করে প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে তার কার্যকারিতা তুলনা করা হয়।

আরেকটি বিষয়ও আশার কারণ। ডিমেনশিয়ার জন্য বর্তমানে গবেষণাধীন এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওষুধ মূলত অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ নতুন চিকিৎসার সন্ধানে বিজ্ঞানীরা শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কারের দিকেই তাকিয়ে নেই; আগে থেকেই মানুষের ব্যবহারে থাকা ওষুধের নতুন সম্ভাবনাও খুঁজে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু বিজ্ঞান যতই এগোক, সামনে একটি বড় বাধা রয়ে গেছে, রোগীকে সময়মতো শনাক্ত করা।

প্রাথমিক পর্যায়ের আলঝেইমারে থাকা অনেক মানুষ জানেনই না যে নতুন চিকিৎসা কিংবা গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিউরোরেডিওলজিস্ট এমার ম্যাকসুইনি বিশ্ব আলঝেইমার প্রতিবেদনে বলেছেন, সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে যাদের আলঝেইমারের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি, তাদের শনাক্ত করতে না পারা। কারণ চিকিৎসার জন্য সুযোগের সময়টা খুবই ছোট।

ম্যাকসুইনির মতে, রোগীরা অনেক সময় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পর্কে জানেন না। নতুন ওষুধ পাওয়ার সুযোগ কীভাবে পাওয়া যায়, সেটিও তাদের অজানা থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘এটি একটি মহামারি। চিকিৎসা পেশায় মানসিকতার পরিবর্তন দরকার, যাতে আরো বেশি মানুষকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পর্কে জানানো হয় এবং সেখানে অংশ নিতে সহায়তা করা হয়। আমাদের কথার চেয়ে কাজ বেশি দরকার।’

এই জায়গাতেই রোগ নির্ণয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্মৃতি ও চিন্তাশক্তির অবনতি ধীর করতে পারে—এমন নতুন প্রজন্মের চিকিৎসা তৈরি হলেও সেগুলো তখনই কাজে আসবে, যখন রোগীদের সময়মতো শনাক্ত করা যাবে। যুক্তরাজ্যে আলঝেইমার রোগ নির্ণয় হওয়া মানুষের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ সর্বোচ্চ মানের রোগ নির্ণয় পরীক্ষার সুযোগ পান। আলঝেইমার্স রিসার্চ ইউকের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা জোনাথন শটের সহ-নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

এ ক্ষেত্রে বায়োমার্কার শনাক্ত করতে পারে এমন রক্ত পরীক্ষা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। প্রাথমিক গবেষণায় এসব পরীক্ষার ফল আশাব্যঞ্জক। তবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা করে এখনো নিশ্চিত হতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞানীয় অবনতির লক্ষণ থাকা মানুষকে এসব পরীক্ষা কতটা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে।

কারণ একটি যুগান্তকারী ওষুধ আবিষ্কার করেও যদি রোগীকে সময়মতো শনাক্ত করা না যায়, তাহলে সেই আবিষ্কারের সুফল তার কাছে পৌঁছাবে না।

এই কারণেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিমেনশিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার বিলিয়ন ডলারের গবেষণাগারের ওপর নির্ভর করবে না; হাভানা, লিমা কিংবা বেঙ্গালুরুর পারিবারিক চিকিৎসকদের ওপরও তা সমানভাবে নির্ভর করতে পারে। আধুনিক গবেষণাগারে নতুন চিকিৎসা তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে সেই চিকিৎসার আওতায় আনা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে চিকিৎসাক্ষেত্রের অগ্রগতির সাথে মিলিয়ে নিতে হবে। আগামী দশকের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ডিমেনশিয়া গবেষণায় অংশ নেয়ার সুযোগ যেন আর মানুষের অধ্যবসায় বা সৌভাগ্যের ওপর নির্ভর না করে। বরং যে কেউ চাইলে যেন সেই সুযোগ বাস্তবেই পান।

আলঝেইমারকে এখনো থামানো যায়নি। নিরাময়ও এখনো অনেক দূরের স্বপ্ন। কিন্তু বিজ্ঞানের লড়াই আর শুধু পরাজয় ঠেকানোর নয়। রোগের অপ্রতিরোধ্য গতিকে একটু ধীর করা, তার আগমন কিছুটা পিছিয়ে দেয়া—এই ছোট ছোট অগ্রগতিই হয়তো একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠবে।

কারণ সব যুদ্ধের প্রথম জয় শত্রুকে পরাজিত করা নয়। কখনো কখনো তার অপ্রতিরোধ্য গতি থামিয়ে দেয়ার মুহূর্তটিই হয়ে ওঠে আশার শুরু।