আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংগৃহীত

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার মধ্যে স্বল্প আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা বাড়ানোর বার্তা দিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঋণ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ, দ্রুত ও সমন্বিত করা, দেশীয় রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়েছে সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী কমিটি। পাশাপাশি আইএমএফের নিজস্ব অর্থায়ন ও কোটাভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আধুনিক করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

Advertisement

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১৬ ও ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) ৫৪তম বৈঠকের ঘোষণায় এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ঘোষণার মূল বার্তা, শুধু অর্থায়ন বাড়িয়ে নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক নীতি, কার্যকর সংস্কার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই দেশগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে এগোতে হবে।

ঋণ পুনর্গঠনে সময়ক্ষেপণ কমানো
জানা গেছে, ঋণের দায়ে চাপে থাকা দেশগুলোর জন্য ঋণ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া আররোও পূর্বানুমানযোগ্য, সময়োপযোগী, সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে কমিটি। এ ক্ষেত্রে জি২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে অগ্রগতি ধরে রাখার পাশাপাশি গ্লোবাল সভরেন ডেট রাউন্ডটেবিলের কাজ এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো কোন দেশের কত ঋণ রয়েছে, কার কাছে কত পাওনা এবং কী শর্তে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া। এ কারণেই সরকারি ও বেসরকারি সব ঋণদাতার কাছ থেকে ঋণসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফসি।

কমিটির এই অবস্থানের তাৎপর্য হলো, ঋণ পুনর্গঠনের আলোচনা শুধু ঋণগ্রহীতা সরকারের সাথে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বিভিন্ন ঋণদাতার মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। তথ্যের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ঋণ সঙ্কটে থাকা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সঙ্কটে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা
আইএমএফ এমন দেশগুলোকে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাদের ঋণ পরিস্থিতি টেকসই, সংস্কার ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কর্মসূচিও রয়েছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সঙ্কটের মুখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর তিন স্তম্ভের পদ্ধতি দ্রুত বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

স্বল্প আয়ের দেশ, ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যম আয়ের অর্থনীতি, সঙ্ঘাত ও অস্থিতিশীলতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র এবং ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসাথে দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্টের (পিআরজিটি) ঋণদানের সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় আর্থিক নিশ্চয়তা দেয়ায় সদস্য দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়েছে কমিটি। 


অন্য সদস্যদেরও দ্রুত সেই নিশ্চয়তা দেয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই ঘোষণাকে সব দেশের জন্য নতুন ঋণ অনুমোদন বা অর্থছাড়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সহায়তার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, সংস্কারের অঙ্গীকার এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পরিকল্পনা বিবেচনায় থাকবে।

রাজস্ব সংগ্রহ ও সুশাসনে জোর
ঋণের চাপ মোকাবিলায় শুধু নতুন অর্থায়ন নয়, নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফসি। ঘোষণায় দেশগুলোকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, দেশীয় উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং সুশাসন উন্নত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই বার্তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাজস্ব আহরণ দুর্বল হলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ঘোষণায় বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো নতুন করনীতি বা নির্দিষ্ট সংস্কার-শর্ত ঘোষণা করা হয়নি। এটি সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার নিয়ে বৃহত্তর দিকনির্দেশনা।
এ ছাড়া ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে দেয়া বিনিময় হার-সংক্রান্ত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে কমিটি। এই অংশে নতুন কোনো বিনিময় হারনীতি বা নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রার জন্য পৃথক নির্দেশ দেয়া হয়নি।

আইএমএফের নীতিকাঠামোয় নতুন নজর
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গ্লোবাল পলিসি এজেন্ডাকে স্বাগত জানিয়েছে কমিটি। সংস্থাটির নজরদারি, ঋণ বিশ্লেষণ, ঋণদান এবং সদস্য দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক নীতিপর্যালোচনাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।

নীতিগত পরামর্শ, অর্থায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় আরো গভীর করার পক্ষেও মত দিয়েছে কমিটি। এর লক্ষ্য, সদস্য দেশগুলো যেন অর্থনৈতিক ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে, অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করতে পারে এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতিকাঠামোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তির সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট নীতিগত প্রভাব নিয়ে আইএমএফের চলমান কাজকেও স্বাগত জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে সংস্থাটির আরো বিশ্লেষণ ও পরামর্শ দেয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ঘোষণায় এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান হ্রাস বা প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

কোটাব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তুতি
আইএমএফকে আন্তর্জাতিক আর্থিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কেন্দ্রে একটি শক্তিশালী, কোটাভিত্তিক এবং পর্যাপ্ত অর্থসম্পদসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। সংস্থাটির ১৬তম সাধারণ কোটাপর্যালোচনার অধীনে কোটাবৃদ্ধিতে সম্মতির জন্য সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া আর বিলম্ব না করে সম্পন্ন করার প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।

একইসাথে ‘দিরিয়াহ গাইডিং প্রিন্সিপলস’কে ভবিষ্যতের কোটাবণ্টন ও শাসনব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত আলোচনার দিকনির্দেশক হিসেবে গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই নীতিগুলো ১৭তম সাধারণ কোটা পর্যালোচনাসহ পরবর্তী আলোচনায় ভূমিকা রাখবে।

আইএমএফের কোটাব্যবস্থা শুধু অর্থায়নের সাথে সম্পর্কিত নয়; সদস্য দেশগুলোর আর্থিক অবদান ও ভোটের ক্ষমতার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে। ফলে কোটাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা প্রতিষ্ঠানের অর্থসম্পদের পাশাপাশি প্রতিনিধিত্ব ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে।

প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সংস্কারেও গুরুত্ব
আইএমএফের কার্যক্রম আধুনিক করা, প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং কর্মীদের দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পক্ষেও সমর্থন জানিয়েছে কমিটি। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কাজে উন্নত প্রযুক্তির সতর্ক ও বিবেচনাপ্রসূত ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

কর্মী নিয়োগে যোগ্যতাভিত্তিক পদ্ধতির গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি কর্মীদের মধ্যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্বাহী পর্ষদ ও পর্ষদের নেতৃত্বেও নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে নির্ধারিত স্বেচ্ছামূলক লক্ষ্য বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংকক সম্মেলনের এই ঘোষণায় দ্বিমুখী বার্তা রয়েছে। একদিকে ঋণ সঙ্কটে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা সহজ করা এবং ঋণ পুনর্গঠনে স্বচ্ছতা বাড়ানো; অন্যদিকে দেশগুলোকে নিজস্ব রাজস্ব, সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়া। একইসাথে আইএমএফের অর্থায়ন, প্রতিনিধিত্ব ও কার্যক্রমের আধুনিকীকরণ নিয়েও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে ঘোষণাটি মূলত নীতিগত অঙ্গীকার ও দিকনির্দেশনা। বাস্তবে এর সুফল কতটা মিলবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারের অগ্রগতির উপর।