
বিমান চালিয়ে আকাশের ক্যানভাসে ছবি আঁকা যায়? তাও আবার এক-আধটা আঁকিবুঁকি নয়, আস্ত একটা শিল্পকর্ম! খোদ পাবলো পিকাসোও হয়তো এমন কাণ্ড ঘটাতে পারতেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পাইলট বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েল সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছেন। ছোট্ট একটি বিমান নিয়ে টানা আট ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে উড়ে এঁকেছেন জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো সিক্স’ বা জিটিএ ৬-এর বিশাল এক ছবি। এ কাজের মধ্য দিয়ে ‘পাইলট পিকাসো’ নামটিকেও আরো সার্থক করে তুলেছেন তিনি।
এনডিটিভি জানায়, গত ৬ নভেম্বর নিজের সেসনা আর১৮২ স্কাইলেন আরজি বিমান নিয়ে এই অভিনব শিল্পকর্ম তৈরি করেন ম্যাকড্যানিয়েল। যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের বেন্টনভিল বিমানবন্দর থেকে সকাল ১১টা ২৯ মিনিটে উড্ডয়ন করেন তিনি। এরপর পরিকল্পিত পথে আকাশে উড়তে থাকেন। প্রায় আট ঘণ্টা আট মিনিট পর সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে একই বিমানবন্দরে ফিরে অবতরণ করেন। পুরো সময়টাতেই তার বিমান যেন হয়ে উঠেছিল এক শিল্পীর তুলির আঁচড়।
তবে ছবিটি সরাসরি আকাশে আঁকা নয়। এখানে রংতুলি কিংবা ক্যানভাসের কোনো বালাই নেই। ম্যাকড্যানিয়েলের তুলির কাজ করে বিমানের গতিপথ, আর ক্যানভাস হলো ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের ডিজিটাল মানচিত্র। আগে থেকেই মানচিত্রে ছবির নকশা ঠিক করে নেন তিনি। তারপর সেই নকশা অনুসারে বিমানের উড্ডয়নপথ সাজান। আকাশে একের পর এক নির্দিষ্ট বাঁক নেন, কখনো দিক পরিবর্তন করেন, কখনো আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। বিমানের জিপিএস তথ্য ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে জমা হতে থাকে। সবশেষে সেই পথের রেখাগুলো একসাথে করলে ফুটে ওঠে কাঙ্ক্ষিত ছবি।
এবারের ছবিতে রয়েছে জিটিএ ৬-এর লোগো। তার ঠিক ওপরে একটি হেলিকপ্টার যেন আকাশে ভেসে আছে। আশপাশে ফ্লোরিডার পরিচিত কিছু অনুষঙ্গও রেখেছেন ম্যাকড্যানিয়েল। আছে কুমির, পামগাছ, একটি স্পোর্টস কার এবং এক নারী। সব মিলিয়ে ভিডিও গেমটির জগৎটাকেই যেন তুলে এনেছেন আকাশের মানচিত্রে।
কাজটি কতটা নিখুঁতভাবে করেছেন, তা বোঝা যায় ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের ছবিতে। ম্যাকড্যানিয়েলের বিমান যখন নকশার হেলিকপ্টার অংশটুকু তৈরি করেছে, তখনই ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবা ফ্লাইটরাডার২৪-এর আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট বিষয়টি নজরে আনে। তারা বিষয়টি প্রকাশ করার পর বিমান চলাচল ও ভিডিও গেমের অনুরাগীদের মধ্যে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে সরাসরি তার বিমানের গতিপথ অনুসরণ করতে শুরু করেন। এভাবেই আকাশে আঁকা ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
এ ধরনের কাজ বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা মোটেও নয়। ম্যাকড্যানিয়েলকে একই সাথে ছবির নকশা এবং বিমান চালানোর হিসাব রাখতে হয়। বিমানের সক্ষমতা, বাঁক নেয়ার পরিসর, উচ্চতা ও অবস্থান—সবকিছু মাথায় রেখে পথ তৈরি করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, শিল্পকর্ম শেষ করতে গিয়ে বিমানের নিরাপত্তার সাথে কোনো আপস করা চলে না। তাই আকাশে ওড়ার আগেই প্রতিটি বাঁক ও গতিপথ পরিকল্পনা করে নিতে হয়।
নিজের কাজের ভিডিওর সাথে ম্যাকড্যানিয়েল লিখেছেন, 'আকাশে জিটিএ ৬ আঁকতে আমার আট ঘণ্টা লেগেছে। তবে সত্যি বলতে, এই মুহূর্তটির জন্য আমি অপেক্ষা করেছি ১১ বছর।' ভিডিও গেমটির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথাই সম্ভবত বলতে চেয়েছেন তিনি।
ম্যাকড্যানিয়েল অবশ্য এবারই প্রথম আসমানকে ক্যানভাস বানাননি। এর আগে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত ‘মোনালিসা’ ছবির অবয়বও এঁকেছেন বিমানের গতিপথ দিয়ে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর আরকানসাস ও ওকলাহোমার আকাশে প্রায় তিন ঘণ্টা ৪৬ মিনিট উড়ে তৈরি করেছিলেন সেই ছবি। ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে বিমানের চলার রেখা মিলিয়ে সেখানে মোনালিসার মুখ, চুল, হাত ও শরীরের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া এডভার্ড মুঙ্কের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য স্ক্রিম’-এর অনুকরণেও আকাশে ছবি এঁকেছেন তিনি।
ম্যাকড্যানিয়েলের এই শিল্পকর্মকে বলা হয় ‘ফ্লাইট পাথ আর্ট’ বা ‘রাডার আর্ট’। বিমান চালনা ও প্রযুক্তির সাথে শিল্পের এমন মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে অভিনব। তার কাজ দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লিখেছেন, 'দেখতে দারুণ লাগল! আমার সন্তানরাও এটিকে জীবনের সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার বলে মনে করেছে।' আরেকজনের মন্তব্য, 'জিটিএ ৬ বাজারে আসার আগেই আমরা জিটিএ ৬-এর আকাশচিত্র পেয়ে গেলাম! সত্যিই অবিশ্বাস্য।'
আরেকজন তো আরো এক ধাপ এগিয়ে লিখেছেন, 'আমার বন্ধু মাঝপথে বিমানের গতিপথ দেখিয়েছিল। দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম, এটা জিটিএ ৬! এই পাইলটকে গেমের মধ্যেই জায়গা দেয়া উচিত। রকস্টার, তাকে ডাউনলোডযোগ্য অতিরিক্ত চরিত্র হিসেবে যুক্ত করো!'
'বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েল আকাশে কোনো রং ছিটিয়ে ছবি
আঁকেননি। তাঁর বিমানের পেছনে রঙিন
ধোঁয়াও বের হয়নি।
তিনি বিমানের চলার পথকে ব্যবহার করেছেন ডিজিটাল ক্যানভাস
হিসেবে। অর্থাৎ আকাশে ছবিটি দেখা যায় না,
দেখা যায় ফ্লাইট
ট্র্যাকিং মানচিত্রে। বিমানের জিপিএস থেকে পাওয়া
অবস্থান ও গতিপথের
রেখা
মিলিয়েই তৈরি
হয় ছবিটি'
প্রসঙ্গত, জিটিএ ৬ গেমটি আগামী ১৯ নভেম্বর প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ এক্স ও এস-এ মুক্তি পাওয়ার কথা। গেমটি আগাম ডাউনলোডের সুযোগ মিলবে ১০ নভেম্বর থেকে। আর সেই মুক্তির আগেই আকাশে তার প্রচার করে ফেললেন এক পাইলট। অবশ্য সাধারণ প্রচার নয়, একেবারে নিজের উড়োজাহাজকে তুলি বানিয়ে!
আকাশে ছবি আঁকার জন্য পিকাসো হওয়ার দরকার নেই—তবে বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েলের মতো পাইলট হওয়া যে জরুরি, তা বলাই বাহুল্য!
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েল আকাশে কোনো রং ছিটিয়ে ছবি আঁকেননি। তাঁর বিমানের পেছনে রঙিন ধোঁয়াও বের হয়নি। তিনি বিমানের চলার পথকে ব্যবহার করেছেন ডিজিটাল ক্যানভাস হিসেবে। অর্থাৎ আকাশে ছবিটি দেখা যায় না, দেখা যায় ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে। বিমানের জিপিএস থেকে পাওয়া অবস্থান ও গতিপথের রেখা মিলিয়েই তৈরি হয় ছবিটি।
এখানে শিল্পের দুটি আলাদা ধরন আছে। একটির নাম ‘ফ্লাইট পাথ আর্ট’ বা ‘রাডার আর্ট’; অন্যটি ‘স্কাইরাইটিং’, যেখানে বিমানের সাহায্যে সত্যিই আকাশে ধোঁয়ার রেখা তৈরি করা হয়। দুটিকে এক করে দেখলে ভুল হবে।
আকাশে রং লাগে কীভাবে?
সত্যিকারের আকাশচিত্র আঁকার জন্য বিমানে বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। সাধারণত বিমানের ইঞ্জিনের নিষ্কাশন নলের কাছে একটি বিশেষ তরল ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। এর জন্য বিমানে আলাদা পাত্রে প্যারাফিন তেল বা খনিজ তেল বহন করা হয়। পাইলট ককপিটের সুইচ বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সাহায্যে প্রয়োজনমতো ওই তেল ইঞ্জিনের উত্তপ্ত নিষ্কাশন নলের কাছে ছড়িয়ে দেন। প্রচণ্ড তাপে তেল বাষ্পে পরিণত হয়ে সাদা ধোঁয়ার মতো রেখা তৈরি করে। বিমান চলতে থাকলে সেই রেখা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাইলট কখনো ধোঁয়া ছাড়েন, কখনো বন্ধ করেন। এভাবেই আকাশে তৈরি হয় অক্ষর, শব্দ কিংবা নানা নকশা।
তবে আকাশে রঙিন ছবি আঁকার ব্যবস্থাও আছে। এর জন্য তেলের সাথে বিশেষ রঞ্জক পদার্থ মেশানো হয়। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর প্রদর্শনী দল ‘রেড অ্যারোজ’ লাল, সাদা ও নীল রঙের ধোঁয়া তৈরি করে এভাবেই। বিমানের বিশেষ ট্যাংকে রাখা তরলের সাথে রং মিশিয়ে পাইলট প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করেন। ফলে আকাশে একসাথে বিভিন্ন রঙের রেখা তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েলের জিটিএ ৬-এর ছবিতে এ ধরনের কোনো রং বা ধোঁয়া ব্যবহার করা হয়নি।
আকাশে কতক্ষণ থাকে ছবি?
আকাশে ধোঁয়া দিয়ে আঁকা ছবি চিরস্থায়ী নয়। বাতাসের গতি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও মেঘের উপস্থিতির ওপর এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ ধরনের লেখা বা ছবি প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম বলছে, অনুকূল পরিস্থিতিতে ধোঁয়ার রেখা ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যের সরকারি এক পরামর্শপত্রে স্কাইরাইটিংয়ের ক্ষেত্রে আবহাওয়াভেদে দুই থেকে চার মিনিট স্থায়ী হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ সব আকাশচিত্রের স্থায়িত্ব এক রকম নয়। বাতাসের ঝাপটা এলেই শিল্পীর আঁকা রেখা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আকাশ আবার আগের মতো ফাঁকা হয়ে পড়ে।
আসমানী ছবির ইতিহাস
বিমানের সাহায্যে আকাশে ছবি আঁকা বা আসমানী ছবি বা বার্তা লেখার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জন সি স্যাভেজ এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯২২ সালের মে মাসে ইংল্যান্ডের এপসম ডাউনসে ঘোড়দৌড়ের আসরে ক্যাপ্টেন সিরিল টার্নার বিমানের ধোঁয়া দিয়ে আকাশে ‘ডেইলি মেইল’ লিখে দেখান। একই বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গিয়ে লেখেন ‘হ্যালো ইউএসএ’। আকাশে ধোঁয়া দিয়ে বার্তা লেখার এই কৌশল দ্রুত বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯২৩ সালে লাকি স্ট্রাইক সিগারেটের প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বড় ধরনের বাণিজ্যিক স্কাইরাইটিং অভিযান শুরু হয়। পরে পেপসিও দীর্ঘদিন এ পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের সংরক্ষণাগারের ইতিহাসে এসব তথ্য রয়েছে।
এরপর প্রযুক্তির উন্নতির সাথে আকাশে ছবি আঁকার ধরনও বদলেছে। ধোঁয়া দিয়ে ছবি আঁকার পাশাপাশি শুরু হয়েছে বিমানের গতিপথ দিয়ে ছবি তৈরির চর্চা। তবে এ ক্ষেত্রে আকাশে কোনো দৃশ্যমান রেখা তৈরি হয় না। বিমান কোথায় গেল, কোন দিকে বাঁক নিল, কত দূর উড়ল—এসব তথ্য জিপিএস ও স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে সংরক্ষিত হয়। পরে ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে সেই রেখাগুলো মিলিয়ে ছবি দেখা যায়। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, জিপিএসনির্ভর এই ধরনের বিমানচিত্রের চর্চা বিস্তৃত হয়েছে মূলত আধুনিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার পর। ২০১৬ সালে জার্মানিতে একটি বিমানের গতিপথ দিয়ে আরেকটি বিমানের ছবি তৈরির ঘটনাও তাদের নজরে আসে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে বোয়িং ৭৮৭ বিমান উড়িয়ে একই বিমানের বিশাল অবয়ব আঁকা হয়েছিল।
তাহলে কি গোটা আকাশই ক্যানভাস হতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে আকাশের বিশাল এলাকাজুড়ে এমন শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে গোটা আকাশকে এভাবে ছবি দিয়ে ভরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। প্রথমত, প্রতিটি বিমানের জন্য নির্দিষ্ট উড্ডয়নপথ ও উচ্চতা মেনে চলতে হয়। যাত্রীবাহী বিমান চলাচল, সামরিক বিমান, বিমানবন্দরের আশপাশের নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হয়। ইচ্ছেমতো আকাশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, বিশাল ছবি আঁকতে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। একাধিক বিমান ব্যবহার করলে তাদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব ও সমন্বয় বজায় রাখাও জরুরি। তার ওপর আবহাওয়া সব সময় অনুকূলে থাকে না। ধোঁয়ার ছবি হলে বাতাসই শেষ পর্যন্ত তা মুছে দেবে।
তবে ফ্লাইট পাথ আর্টের ক্ষেত্রে আরেকটি সীমাবদ্ধতা আছে। এখানে ছবি তৈরি হয় মানচিত্রে, বাস্তব আকাশে নয়। তাই যত বড় ছবিই আঁকা হোক, নিচে দাঁড়িয়ে তাকালে তা দেখা যাবে না। দেখতে হবে ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের পর্দায়। অর্থাৎ এক ধরনের আকাশচিত্র মানুষের চোখে ধরা দেয় আকাশের দিকে তাকালে, আর অন্যটি দেখতে হয় মানচিত্রে চোখ রেখে।
আকাশের ক্যানভাস তাই এখন আর শুধু বিজ্ঞাপনের জন্য কয়েকটি শব্দ লেখার জায়গা নয়। কেউ সেখানে রঙিন ধোঁয়ায় বার্তা লেখেন, কেউবা হাজার হাজার ফুট ওপর দিয়ে বিমান চালিয়ে তৈরি করেন মোনালিসা কিংবা জিটিএ ৬-এর অবয়ব। পার্থক্য শুধু একটাই—কেউ আঁকেন আকাশে, আর কেউ আঁকেন আকাশের মানচিত্রে। আর বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েল দ্বিতীয় দলের শিল্পী। তাঁর ক্যানভাসে রং নেই, তুলি নেই; আছে জ্বালানি, জিপিএস আর অসাধারণ উড়ান-দক্ষতা।
আকাশে প্রেমের প্রস্তাব : ‘উইল ইউ মেরি মি?’
আকাশে শুধু ছবি নয়, প্রেমের কথাও লেখা হয়। ‘আই লাভ ইউ’ কিংবা ‘উইল ইউ মেরি মি?’—এমন বার্তা লিখে প্রিয় মানুষকে চমকে দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে ভাড়া করেন পেশাদার স্কাইরাইটার। দেশটির লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের একটি প্রতিষ্ঠানই বছরে ৫০টির বেশি বিয়ের প্রস্তাব আকাশে লিখে দেয়। অর্থাৎ কারো কাছে আকাশ ক্যানভাস, কারো কাছে আবার প্রেম নিবেদন বা বিয়ের প্রস্তাব জানানোর জায়গা। পিকাসো তুলিতে ছবি আঁকতেন, আর এই পাইলটেরা আঁকেন বিমানের গতিপথ দিয়ে।
আকাশে প্রেমের কথা লেখার এই রীতি এখন বেশ পরিচিত। বিশেষ করে বিয়ের প্রস্তাবকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকে ভাড়া করেন পেশাদার স্কাইরাইটার। কেউ লেখান ‘আই লাভ ইউ’, কেউ ‘উইল ইউ মেরি মি?’। প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মাথার ওপর এমন প্রশ্ন ভেসে উঠলে চমকে যাওয়াই স্বাভাবিক!
যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের একটি প্রতিষ্ঠান বছরে ৫০টিরও বেশি বিয়ের প্রস্তাব আকাশে লিখে দেয়। সাধারণত একটি বিমান দিয়ে ছয়টি পর্যন্ত অক্ষর লেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘ বাক্য লিখতে হলে একসাথে পাঁচ থেকে সাতটি বিমান ব্যবহার করতে হয়। তারা সমন্বয় করে আকাশে ধোঁয়ার বিন্দু তৈরি করে। সেই বিন্দুগুলো মিলেই ফুটে ওঠে শব্দ ও বাক্য। এই পদ্ধতির নাম ‘স্কাইটাইপিং’।
বাস্তব জীবনের এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, ইংল্যান্ডের উত্তর লিংকনশায়ারে। কোরি রবিনস তাঁর প্রেমিকা ডেইজি ওয়ার্ডকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য একটি বিমান ভাড়া করেন। বিমানটির পেছনে টেনে নেয়া বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ডেইজি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ পরিবারের সাথে বাড়ির কাজ শেষ হওয়ার আনন্দ উদ্যাপন করছিলেন ডেইজি। কোরি তাঁকে বাইরে আসতে বলে আকাশের দিকে তাকাতে বলেন। বার্তাটি দেখার পর তিনি যখন আবেগে কেঁদে ফেলেন, কোরি তখন সামনে এসে এক হাঁটু গেড়ে আংটি হাতে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ডেইজি শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন। ঘটনাটি বিবিসি প্রকাশ করেছিল ৩০ জুলাই ২০২৪-এ।
আবার ২০২১ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশে দেখা গিয়েছিল আরো বড় আয়োজন। মলি প্র্যাট নামের এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে আকাশে একের পর এক বার্তা লেখানো হয়। প্রথমে ছিল ‘উইল ইউ মেরি মি, মলি প্র্যাট?’ এরপর ‘সে রাজি হয়েছে’, ‘আমি তোমাকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি’ এবং ‘সারা জীবন তোমার সাথে কাটাতে চাই’—এমন বার্তাও ভেসে ওঠে। সব মিলিয়ে ১০টি বার্তা লেখার জন্য খরচ হয়েছিল ১৭ হাজার ৫০০ ডলার। ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দ্য ইনডিপেনডেন্ট।
শুধু ধোঁয়া দিয়ে লেখা নয়, বিমানের গতিপথ দিয়েও প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে টেরি উইলিয়ামসন তাঁর প্রেমিকা টেলর বার্চামকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে আকাশে প্রায় দুই ঘণ্টা বিমান চালান। তাঁর বিমানটি ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে লিখে ফেলে, ‘উইল ইউ মেরি মি, টেলর?’ প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় উড়ে অসংখ্য বাঁক নিয়ে এই লেখা তৈরি করেন তিনি। প্রেমিকা একটি কফিশপে বসে নিয়মিত ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাঁর বিমানের অবস্থান দেখতেন। সেদিন অস্বাভাবিক গতিপথ দেখে প্রথমে অবাক হলেও পরে বার্তাটি বুঝতে পারেন। তিনিও সম্মতি দেন। ঘটনাটি প্রকাশ করে পিপল সাময়িকী।
আকাশে প্রেমের প্রস্তাবের বাণিজ্যিক ব্যবহার অবশ্য আরো পুরোনো। আশির দশকে পেপসির একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে ‘ম্যারি মি সু’ (সু, আমাকে বিয়ে করো) বার্তাটি আকাশে লেখার দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। এটি বাস্তব কোনো বিয়ের প্রস্তাবের ঘটনা নয়, বিজ্ঞাপনচিত্রের গল্প। তবে আকাশে প্রেমের বার্তা লেখার জনপ্রিয়তা তৈরিতে এ ধরনের বিজ্ঞাপনের ভূমিকা ছিল।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








