
‘সব সংকটে সকল সড়োকে, ঘূর্ণাবর্তে ও বজ্র কড়োকে
প্রলয় তুফানে শহিদী রক্তে মুক্তির ছবি আঁকবো
হোক দুশমন অগণন তবু দেখানো মরণ সন্ধ্যা
নীতিহীনতার মরু বিয়াবনে স্বপ্ন তাদের বন্ধ্যা।’
প্রলয়ঝড়, বজ্রপাত কিংবা শত্রুর বিপুল শক্তি—কোনো কিছুতেই পিছু হটতে রাজি নয়, বরং প্রতিকূলতার মুখে আরো দৃঢ় হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। ফররুখ আহমদের কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলোর মতোই ইরান এখন প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দিতে চাইছে, নতুন করে হামলা হলে যুদ্ধ আর তাদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে আটকে থাকবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গত ৩১ অক্টোবর সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো হুমকির জবাব দিতে হবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে, ‘ভৌগোলিক সীমারেখার তোয়াক্কা না করে’। একই সাথে ইরানের নাগালের মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গোয়েন্দা তৎপরতা, সামরিক কৌশল ও দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার কথাও বলেছেন। ইরানের এই অবস্থান শুধু পাল্টা হামলার হুমকি নয়; এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ ঠেকাতে প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধের মূল্য বাড়িয়ে দেয়ার কৌশল।
মিডলইস্ট মনিটর জানায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিমান, যুদ্ধজাহাজ কিংবা সামরিক ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে না। বরং দেশটি বোঝাতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও কোনো সংঘাতকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা তার পক্ষে সহজ হবে না।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। ৩০ অক্টোবর কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আবারো তেহরানে যান। তবে আলোচনার শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, আগে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি মীমাংসা হোক। ইরান চায়, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়া হোক এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক। হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে, এই বিরোধ কত দ্রুত বিশ্ববাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লেগেছে। তবে রয়টার্স এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। অন্যদিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বস্তু আঘাত হানায় একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের বার্তা শুধু এই নয় যে, দেশটি আবারো যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। বরং নতুন সংঘাত শুরু হলে তা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বিস্তৃত, ব্যয়বহুল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এটাই উত্তেজনা বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার কৌশল। ইরান জয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চাইছে, সীমিত পরিসরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সুযোগ আর আগের মতো নেই।
প্রচলিত সামরিক কৌশলে প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখার মূল কথা হলো, হামলার সম্ভাব্য ক্ষতিকে তার লাভের চেয়ে বেশি করে তোলা। কোনো দেশ প্রতিপক্ষের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব করে দিয়ে অথবা পাল্টা আঘাতের ভয় দেখিয়ে এ কাজটিই করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রচলিত সামরিক শক্তিতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে ইরান। কিন্তু তারপর দেশটি দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় কৌশলটি অনুসরণ করছে। ক্ষেপণাস্ত্র, একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সামরিক স্থাপনা এবং আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সক্ষমতা দিয়ে তারা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করে।
গত আট মাসের যুদ্ধে এই কৌশলের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই প্রকাশ পেয়েছে। সিআরএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরান অঞ্চলজুড়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন ছুড়েছে। লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরাইল, উপসাগরীয় দেশগুলো, মার্কিন সামরিক স্থাপনা, কূটনৈতিক কেন্দ্র, জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির হাতে এখন কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা নিয়েও বিভিন্ন হিসাব আছে। ইরানের জন্য অসীম অস্ত্রভান্ডার প্রয়োজন নেই। প্রতিপক্ষের ক্ষতি করা, তাদের প্রতিরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করার মতো সক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট।
‘ভৌগোলিক সীমারেখার তোয়াক্কা না করে’ জবাব দেয়ার নির্দেশের অর্থ হলো, ইসরাইলের পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে মার্কিন স্থাপনা এবং এমনকি অপ্রচলিত বা অদৃশ্য ব্যবস্থাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আওতায় আসতে পারে। তবে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদের নির্দেশের অর্থ এই নয় যে, ইরান নতুন কোনো সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে কিংবা হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। বরং সামরিক কমান্ডারদের সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিস্তৃত পরিসর বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হতে পারে হরমুজ প্রণালী। ইরান ও ওমানের মাঝখানের এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি চলাচল করে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পারাপার হয়েছে। যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন দিয়ে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৪৭ লাখ ব্যারেল। স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় যা অনেক কম।
যুদ্ধের কারণে এই নৌপথের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৪৯ লাখ ব্যারেল তেল পারাপার হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ৪৯ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও দৈনিক ৭৪০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৮০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়ায়। এই নৌপথ দিয়ে যাওয়া তেলের বড় অংশ এশিয়ার বাজারে পৌঁছায়। ফলে এর প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি ও শিল্পকারখানার ওপরও পড়ে।
ইরানকে দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রাখতে হবে, এমন নয়। এই পথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিলেই জ্বালানি পরিবহন ব্যয়, বিমা ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যেতে পারে। সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও আছে। দীর্ঘদিন সরবরাহ ব্যাহত হলে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এশিয়ার ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন। সীমিত হামলায় ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা কিংবা ইচ্ছা পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে। আবার বড় ধরনের অভিযান চালালে ইরানের সামরিক শক্তি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলে। জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সিআরএসের হিসাবে, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৮২৪ জন আহত হয়েছেন। ইরানের হামলা ঠেকানো এবং যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বহন করার সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সীমিত।
তবে ইরানের এই কৌশলেও বড় ঝুঁকি রয়েছে। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর পরিসর যত বাড়বে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ততই ইরানের সামরিক প্রস্তুতিকে আক্রমণের পূর্বাভাস হিসেবে দেখতে পারে। তখন আত্মরক্ষার প্রস্তুতিও তাদের কাছে হুমকি হয়ে উঠবে। পাল্টা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বাড়তে পারে সংঘাতের ঝুঁকি। এমনকি ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হওয়ার আগেই দেশটির ওপর নতুন করে হামলার তাগিদ তৈরি হতে পারে। এতে কূটনৈতিক সমঝোতার পথও আরো কঠিন হয়ে পড়বে। কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও ছাড় দেয়ার শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য এখনো কাটেনি। ইরান চায় অবরোধ ও তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় যেকোনো সমঝোতার কেন্দ্রে থাকুক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরানের হুঁশিয়ারিতে ওয়াশিংটন নতুন যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে তেহরানের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে, সময়ের সাথে ইরান আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তাহলে আলোচনার বদলে নতুন হামলার পথও বেছে নিতে পারে।
ইরানের নতুন কৌশলের মূল দ্বন্দ্ব এখানেই। যুদ্ধ ঠেকাতে দেশটি প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধের ঝুঁকি ও মূল্য বাড়িয়ে দিতে চাইছে। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা সম্ভব না হলেও মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগকে ব্যয়বহুল করে তোলা এবং সেই শক্তিকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ নিতে না দেয়াই তেহরানের লক্ষ্য। কিন্তু প্রতিপক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার এই চেষ্টা উল্টো নতুন যুদ্ধের পথ খুলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ইরানের এই হুঁশিয়ারি ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে রাখবে, নাকি নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








