সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

অতীতে মানুষ বন-জঙ্গলে যেতে ভয় পেত বাঘ, সিংহ কিংবা বিষাক্ত সাপের মতো প্রাণীর ভয়ে; কিন্তু দিন পাল্টে গেছে। মানুষ এখন বনে যেতে ভয় পায় দস্যুদের কারণে। হিংস্র প্রাণীর পরিবর্তে দস্যুরাই যেন এখন বনের রাজা বনে গেছে! 
সুন্দরবনে দস্যুদের যে ত্রাসের রাজত্ব চলছে তা উদ্বেগজনক। এর ফলে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের জীবিকার পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। 
শ্যামনগরের পাঁচটি ইউনিয়নে প্রায় ৩৫ হাজার বনজীবী রয়েছেন। এসব মানুষের বেশির ভাগই সুন্দরবনের ভেতরে এবং আশপাশে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে এবং মধু আহরণসহ নানাভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন; কিন্তু তাদের এখন দস্যুদের বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হচ্ছে। ফলে তারা বিপাকে পড়েছেন। গত দুই বছরে তিনবার বনদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়া এক বনজীবী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘একবার দিছি ৬৫ হাজার, একবার দিছি এক লাখ ৯৬ হাজার, আরেকবার দিছি ৮০ হাজার। আরো ৮০ হাজার ফোন করে চাচ্ছে। তাদের ভয়ে জঙ্গলে যেতে পারছি না। এখানে অধিকাংশ মানুষ গরিব। আমরা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। আমরা যদি সুন্দরবনে যাতি না পারি তো খাবো কী?’
দীর্ঘদিন দস্যুরা সেখানে বনজীবীদেরকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করেছে। দস্যুতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের আগে। অনেক দস্যু সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের অস্ত্রও জমা দিয়েছিল। ফিরে গিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে। ৫ আগস্টের পর বনদস্যুরা আবার যেন স্বরূপে ফিরে এসেছে। এখন বনে ঢুকতে সরকারি অনুমতির বাইরেও দস্যুদের বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে পাস নিতে হচ্ছে। সুন্দরবনে কার্যত দস্যুদেরই দখল প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।
নতুন করে দস্যুতা বেড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। অতীতে যারা দস্যুতা থেকে ফিরে গিয়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হয়েছিল তারা আবার কেন দস্যুতায় ফিরে এলো তা জানতে হবে। আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা আছে কি না সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ওই সব অঞ্চলে বেশ কার্যকর রয়েছে। নতুন গঠিত এসআরবিকেও এর সাথে যুক্ত করা যায়। যৌথ অভিযানের মাধমে তাদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। যৌথ বাহিনীর এই অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। 
আর যদি এসব দস্যু পেশাগত সঙ্কটের কারণে দস্যুতায় ফিরে আসে সে ক্ষেত্রে তাদের আবারো অন্য পেশায় ফিরিয়ে নিতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের সাথে আলোচনার একটি পথ খোলা রাখতে হবে। দমনের বদলে সংশোধনের পথও দেখাতে হবে। তাদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান দিতে হবে। 
গুটিকয়েক বনদস্যুর কাছে সুন্দরবন এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।  যে করেই হোক বনদস্যুদের দস্যুতা থেকে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করতে হবে। তাদের পেশাকে নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে সেখানকার মানুষ যাতে সবসময় নিরাপদে তাদের পেশা চালিয়ে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। বনজীবীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

Advertisement