রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা লাশের সারি 
রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা লাশের সারি । সংগৃহীত

রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা লাশের সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। একের পর এক পাওয়া যাচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ। রাজধানীর শুধু শাহবাগ থানা এলাকায় গত এক মাসেই উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১৫টি লাশ, যাদের পরিচয় জানা যায়নি। লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।

Advertisement

সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে গতকাল এ সম্পর্কিত যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে তা রীতিমতো উদ্বেগের। প্রতিবেদনে শাহবাগ থানা পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শাহবাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা থেকে ৭৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচয় জানা গেছে মাত্র ১৪ জনের। বাকি ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি। ২০২৫ সালেও ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এ দিকে গত ২১ মাসে উদ্ধার হয় ১৬০টি লাশ, যার মধ্যে পরিচয় মেলে ২৭টির। অজ্ঞাতপরিচয় থেকে যায় ১৩৩টি। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ লাশ ছিল অজ্ঞাতনামা। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংস্থাটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ৪৬০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৩ সালে ৪৯০টি লাশ রাজধানীর রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করেছে। 

প্রতিবেদনে বিশেষ করে শাহবাগ থানা এলাকায় এত বেশি অজ্ঞাত লাশ পাওয়ার কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য ও সমাজবিজ্ঞানীর অভিমত নেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, শাহবাগ থানা এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষের বসবাস, যাদের কোনো ঠিকানা নেই, পরিচয়পত্র নেই। এলাকাটির মধ্যে পড়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এলাকা, চানখাঁরপুল, হাইকোর্ট মাজার, দোয়েল চত্বর ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। দৈনন্দিন কাজে ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় কার্জন হলের ফুটপাথ বা আশপাশে, এমনকি একাধিক মেট্রো স্টেশনের নিচেও অসংখ্য ভাসমান মানুষকে শুয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। এদের অনেকে হাইকোর্টের মাজারে দিনে দুইবেলা খিচুড়ি খেতে পায়। কেউবা আশপাশের দোকানিদের করুণার ওপর বেঁচে থাকে। কেউ হয়তো বাঁচার মরিয়া চেষ্টায় মাদকপাচার, ছিনতাই, রাহাজানি, চুরিচামারির মতো অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। 

সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক সংশ্লিষ্ট দৈনিককে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীর ভাসমান মানুষের পরিচয় সংগ্রহ বা তালিকা করা প্রয়োজন। এতে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে গেলে যেমন চিহ্নিত করা যাবে, তেমনি মৃত্যুর পর তাদের লাশ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। এটি সরকারের অন্যতম জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অন্য দফতরগুলোরও দায়িত্ব ভাসমান মানুষের কল্যাণে উদ্যোগ নেয়া। কিন্তু দেখে শুনে মনে হয় না কারো কোনো দায়িত্ব আছে। এই দায়িত্বহীনতা প্রমাণ করে আমাদের সমাজ প্রায় চেতনাশূন্য বা মৃতসম। সমাজে জ্যান্ত মানুষের বেশে মূলত মৃতরা হেঁটে বেড়াচ্ছে। কারণ জীবিত কারো পক্ষে সমাজের একটি শ্রেণীর মানুষের তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চাক্ষুষ বাস্তবতা উপেক্ষা করা অসম্ভব।