
দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজায়নের বর্ণিল প্রচারণা চলছে। একই সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অজুহাতে শতবর্ষী গাছ কেটে সরকার দ্বৈত নীতির প্রকাশ ঘটাচ্ছে।
নয়া দিগন্তে গতকাল সরকারের উন্নয়ননীতি ও তা বাস্তবায়নের পরস্পরবিরোধী দু’টি সংবাদ ছাপা হয়েছে। পত্রিকাটির শেষের পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম— ‘২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ’। এতে বলা হয়েছে, ‘সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। চলতি বছর প্রায় পাঁচ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এই পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৬৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।’ অন্য খবরটি ছাপা হয় ষষ্ঠ পৃষ্ঠায়; নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নের নামে বৃক্ষনিধন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি সড়ক ও ফুটপাথ সম্প্রসারণের নামে শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আরো শত শত গাছ কাটার পরিকল্পনার খবর প্রকাশ হয়েছে। এটি সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সদিচ্ছার বিপরীত।
সরকার জাতীয় পর্যায়ে ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। উপকূলীয় জনপদ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততায় কোটি কোটি চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে গাছরক্ষার সেইরকম সদিচ্ছা অনুপস্থিত। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চার লেনের সড়ক কিংবা ফুটপাথ নির্মাণে পরিবেশবান্ধব বিকল্প নকশা বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও স্রেফ ‘সহজ পথ’ হিসেবে গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যখন বলেন, ‘উন্নয়নের প্রয়োজনে গাছ কাটতে হবে’। তখন প্রশ্ন ওঠে, চারা রোপণের কোটি কোটি টাকার কর্মসূচি কি শুধু পরিসংখ্যান আর প্রচারণা? যে চারা আজ রোপণ করা হচ্ছে, তা পূর্ণাঙ্গ গাছ হতে দীর্ঘ সময় নেবে। অথচ চোখের পলকে কেটে ফেলা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা জীববৈচিত্র্য, ছায়া ও ইতিহাসের রূপকার এসব পুরনো গাছ।
উন্নয়ন ও পরিবেশ কখনো পরস্পরবিরোধী হতে পারে না। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশ-পরিবেশের ধারা বজায় রেখে অবকাঠামোগত অগ্রগতি অর্জন করাই টেকসই উন্নয়ন। উন্নত বিশ্বে যেকোনো সড়ক সম্প্রসারণ বা ভবন নির্মাণে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। সেখানে বৃক্ষ বাঁচিয়ে বা প্রতিস্থাপন করে নকশা তৈরি করা হয়। আমাদের দেশেও এই সংস্কৃতি বাধ্যতামূলক করা দরকার। অযথা অপরিকল্পিতভাবে ইট-পাথরের রাজত্ব গড়তে গিয়ে বৃক্ষনিধন চূড়ান্ত বিচারে পুরো জলবায়ু এবং জনজীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
সরকারের উচিত নীতি ও বাস্তবায়নের দ্বৈত অবস্থান থেকে সরে আসা। সেই সাথে চারা রোপণের বিশাল পরিসংখ্যান দেখানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সবুজ ও পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষরাজি রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করা। এটি প্রয়োগ এখন খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি ধ্বংস করে যে উন্নয়ন; তা কখনো দীর্ঘমেয়াদে প্রাণবৈচিত্র্যের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। প্রাণবৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন নকশায় সবুজ রক্ষা করে দেশের অগ্রযাত্রার পথ সুগম করা হোক এখনকার নীতি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








