সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ব্যাংকিং খাতে আমানত বাড়ছে, ব্যাংকগুলোতে তারল্যের অভাব নেই, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তিদায়ক উন্নতি হয়েছে। নীতি সুদহার কমিয়ে কম খরচে টাকা সরবরাহের কথাও বলা হয়েছে— তারপরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ থেকে সাড়ে ৪ চার শতাংশের ঘরে। এই প্রবৃদ্ধি বিগত তিন দশকে সবচেয়ে কম। আবার দেখা যাচ্ছে, যারা ঋণ চাইছেন, তাদের একটি অংশ ঋণ পাচ্ছেন না। এর কারণ কঠোর যাচাই, উচ্চ কার্যকর সুদহার, জামানত এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ নেয়ার মতো নিরাপদ বিনিয়োগ নেই, সেই সাথে নেই ঋণ দেয়ার মতো স্বস্তিও। বলা যায়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও আস্থার সঙ্কট রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মূল মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় নীতি সুদ কিছুটা কমানো হলেও গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাংকঋণের প্রকৃত কার্যকর সুদহার এখনো ১২ শতাংশের কাছাকাছি। সুদের এই হারের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদনের বাস্তব সঙ্কট ও অনিশ্চয়তা। দেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিয়ে প্রায় পৌনে দুই হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্যাস সংযোগের জন্য। কাঁচামাল ও জ্বালানির অভাবে কারখানার সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি কেনার ঝুঁকি কেন নেবেন উদ্যোক্তারা? 
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (সিএমএসএমই) কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। এই শিল্পগুলোতে সঙ্কট আরো বেশি। এ বছর মার্চ মাসের শেষে এই খাতে মোট ঋণ স্থিতি কমেছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের অনুপাত ২৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে সিএমএসএমই খাত এখন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংকের কঠোর জামানত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল টপকাতে পারছেন না, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেয়ার সাহস পাচ্ছে না।
উদ্বেগজনক দিক হলো সরকারের ক্রমবর্ধমান ব্যাংকনির্ভরতা। এনবিআর কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৭ শতাংশ পিছিয়ে থাকায় ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে বিপুল ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কাছেও এখন বেসরকারি বিনিয়োগে ঝুঁকিতে থাকার চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে টাকা খাটানো নিরাপদ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এতে ব্যাংক থেকে অর্থের প্রবাহ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না, ব্যবহার হচ্ছে সরকারের পরিচালন ও ঘাটতি ব্যয়ে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ঋণ-স্থবিরতা কেবল ব্যাংকিং খাতের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি পুরো বাস্তব অর্থনীতির দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। সুদের হার কমিয়ে ঋণ সহজ করার চেষ্টা প্রশংসনীয়। কিন্তু উদ্যোক্তার কাছে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, স্থিতিশীল নীতিমালার নিশ্চয়তা এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির বাজার না থাকলে সস্তা ও সহজ ঋণও বোঝা মনে হতে পারে।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আমরা এমন এক অর্থনীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে জলাশয়ে পানি থই থই করছে; কিন্তু সেই পানি খাওয়ার সাহস করতে পারছেন না তৃষ্ণার্ত ব্যবসায়ীরা। 
এই অচলাবস্থা থেকে বের হতে হলে সরকারকে রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। কমাতে হবে ব্যাংকনির্ভরতা। আটকে থাকা শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসায়িক ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।
ব্যাংকের ভল্টে টাকা জমে থাকা অর্থনীতির সুস্থতার লক্ষণ নয়; টাকার চাকা যদি কারখানার চাকা ঘোরাতে না পারে, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Advertisement