মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও গৌরবময় জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যার জন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। এটি কখনোই ‘দুর্বল’ প্রতিষ্ঠান ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে দেশ ও জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সেবায় প্রতিষ্ঠানটি সমৃদ্ধ হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো চটকদার প্রচারণার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক মূল্যায়ন ন্যায়সঙ্গত নয়। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস, পেশাগত সাফল্য, আত্মত্যাগ এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণে অব্যাহত অবদানের আলোকে একে বিচার করতে হবে। 
সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ গ্রহণ করেন। এই অঙ্গীকার নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। যুদ্ধ, পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাস দমন, দুর্যোগ মোকাবেলা, অবকাঠামো নির্মাণ, জাতীয় উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তারা বারবার এই অঙ্গীকারের প্রমাণ দিয়েছেন। বড় দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় সেনাসদস্যরাই সবার আগে দুর্যোগকবলিত দুর্গম এলাকায় পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছেন।
জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সঙ্ঘাতপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ, রোগব্যাধি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যেও তারা পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের কর্মদক্ষতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। 
বিশ্বের কোনো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত ভুল, পেশাগত ব্যর্থতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। সেনাবাহিনীও মানুষের সমন্বয়ে সংগঠিত। তাই বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ব্যবসা বা রাজনৈতিক সংগঠনের মতো সেনাবাহিনীতেও দু-একজন বিচ্যুত বা অসৎ ব্যক্তি থাকতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের দায় গোটা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যায় না। অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামরিক ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করাই সঠিক পথ। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর শক্তি এই দাবিতে নয় যে, সেখানে কোনো ভুল ঘটতেই পারে না; বরং তার শক্তি হলো ভুল বা অপরাধ চিহ্নিত করে দায়ী ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা।
সামরিক শৃঙ্খলা স্বভাবতই কঠোর। সেনাসদস্যরা সুস্পষ্ট চেন অব কমান্ডের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের নিজস্ব নিয়ম, বাধ্যবাধকতা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে এবং সামরিক প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে। একই সাথে এসব প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর ও স্বচ্ছ রাখতে হবে। আইনানুগ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে; কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের সংস্কৃতি, গুজব, অপবাদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ও জনবিশ্বাস— উভয়েরই ক্ষতি করে। 
জুলাইয়ের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বা গণ-আন্দোলনের পর সামাজিক মাধ্যমের কিছু অংশে সেনাবাহিনীকে ঘিরে অভিযোগ, খণ্ডিত বা সম্পাদিত ভিডিও, বেনামি দাবি এবং অনুমাননির্ভর প্রচারণার বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু প্রচারণার উৎস হতে পারে ভুল বোঝাবুঝি, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা তথ্যের ঘাটতি থেকে। আবার কিছু অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হতে পারে জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সন্দেহ এবং দূরত্ব সৃষ্টি। সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা ঠিক নয়; তবে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত অপতথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অস্তিত্ব সম্পর্কেও সরল থাকা চলে না। 
জাতিসঙ্ঘের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য হলো ‘মিসইনফরমেশন’; আর মানুষকে প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে তৈরি ও প্রচার করা মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য হলো ‘ডিসইনফরমেশন’। জাতিসঙ্ঘ সতর্ক করেছে যে, এ ধরনের তথ্যযুদ্ধ মোকাবেলায় শুধু নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; জনগণের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, গণমাধ্যম-সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী ও নির্ভুল তথ্য প্রকাশ জরুরি। 
আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু ট্যাংক, কামান, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পরিচালিত হয় না। বিভ্রান্তিকর বয়ান, জাল নথি, বিকৃত ছবি, কৃত্রিম অডিও-ভিডিও, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিসংখ্যান এবং সমন্বিত অনলাইন প্রচারণাও আধুনিক সঙ্ঘাতের শক্তিশালী অস্ত্র। কেউ যদি জনমনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে আক্রমণের আগেই সে একটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে মানসিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। সৈনিক ও জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হাইব্রিড যুদ্ধের একটি পরিচিত কৌশল। জনগণ যখন প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে, তখন জাতীয় সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। শান্তির সময় এর ক্ষতি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না; কিন্তু জাতীয় সঙ্কট বা যুদ্ধের সময় এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই বিপদের গুরুত্ব প্রমাণ করে। ন্যাটো ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিদেশী অপতথ্য ও তথ্যপ্রভাবকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ পরিকল্পিত অপপ্রচার সরকারি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং সমাজকে বিভক্ত করে। 
তবে অপতথ্য মোকাবেলার নামে যেন মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা কিংবা আইনসঙ্গত সমালোচনা দমন করা না হয় সে বিষয়েও ইউরোপ গুরুত্ব দেয়।  বাংলাদেশের জন্যও এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিত অপপ্রচার থেকে রক্ষা করতে হবে; কিন্তু সেই প্রয়োজনকে সত্য প্রকাশ, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন বা ন্যায়সঙ্গত জবাবদিহির দাবি বন্ধ করার অজুহাত বানানো উচিত নয়। 
প্রতিরক্ষা নীতি, সামরিক বাজেট, বাহিনীর কর্মদক্ষতা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের অবশ্যই আছে। গঠনমূলক সমালোচনা একটি প্রতিষ্ঠানকে সংশোধিত, আধুনিক ও আরো দক্ষ হতে সাহায্য করে। কিন্তু সমালোচনা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার এক বিষয় নয়। গঠনমূলক সমালোচনা যাচাইযোগ্য তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উত্তর দেয়ার সুযোগ দেয় এবং সমস্যার সমাধান কামনা করে। এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি শক্তিশালী করে। বিপরীতে, অপপ্রচার পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয়, বেনামি বা জাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে, ঘটনাকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করতে চায়— যা সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলে। 
সামরিক বিষয়ের সংবেদনশীলতার অর্থ এই নয় যে, সবকিছুই চিরকাল জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সশস্ত্রবাহিনীর ওপর নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় পর্যবেক্ষণ, আর্থিক জবাবদিহি এবং অভিযোগ তদন্তের আইনসঙ্গত ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রই তার সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সেনা মোতায়েন, নিরাপত্তা দুর্বলতা, সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য অথবা সংবেদনশীল কমান্ড-সংক্রান্ত বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরে না। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ তথ্যও বিভিন্ন উৎসের সাথে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে প্রতিপক্ষ কোনো বাহিনীর সক্ষমতা, দুর্বলতা, অবস্থান ও কর্মকৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারে। এ কারণেই পৃথিবীর সব পেশাদার সামরিক বাহিনীতে অপারেশনাল নিরাপত্তার নীতি অনুসরণ করা হয়।
সরকারকে সংবিধান, আইন এবং উপযুক্ত কমান্ড চ্যানেলের মাধ্যমে সশস্ত্রবাহিনীর কল্যাণ, প্রস্তুতি, আধুনিকায়ন ও মনোবল নিশ্চিত করতে হবে। সেনাসদস্য ও তাদের পরিবার উপযুক্ত আবাসন, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, ন্যায্য ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা এবং অবসর-পরবর্তী সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। তাদের কোনো যৌক্তিক অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত ও ন্যায্যভাবে সমাধান করা প্রয়োজন। একই সাথে সেনা কর্তৃপক্ষকেও বুঝতে হবে যে, জনবিশ্বাস রক্ষার জন্য সময়োপযোগী ও তথ্যসমৃদ্ধ যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশনাল কারণে কিছু ক্ষেত্রে নীরবতা অপরিহার্য হতে পারে; কিন্তু অপ্রয়োজনীয় নীরবতা তথ্যের শূন্যতা সৃষ্টি করে, আর সেই শূন্যস্থান খুব দ্রুত দখল করে নেয় গুজব ও অপপ্রচার। 
ইউটিউবার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষ্যকারদের বুঝতে হবে, সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো ভিউ, ফলোয়ার কিংবা বিজ্ঞাপনী আয় বাড়ানোর উপকরণ হওয়া উচিত নয়। কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রচারের আগে প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রশ্ন করা উচিত, তথ্যটির মূল উৎস কে বা কোথায়? তথ্যটি সত্য ও প্রমাণিত কি না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেয়া হয়েছে কি না? তথ্য প্রকাশের ফলে কোনো সেনাসদস্য, স্থাপনা বা অভিযান ঝুঁকির মুখে পড়বে কি না? বিষয়টি জনগণকে সত্যিই অবহিত করছে, নাকি উত্তেজনা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে? একটি পোস্ট পরে মুছে ফেলা সম্ভব; কিন্তু সেটির মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাজনিত ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের অর্থ তাদের প্রতিটি কাজ প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করা নয়; বরং এর অর্থ হলো ন্যায়সঙ্গত, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং জাতীয় জীবনে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা উপলব্ধি করা। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরা এমন একটি সেনাবাহিনী দেখতে চাইবে, যা তার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এমন একটি জনগোষ্ঠী চাইবে, যারা দেশের প্রতিরক্ষাকারীদের বিশ্বাস করে না। রাজনৈতিক অপব্যবহার কিংবা দায়িত্বহীন অনলাইন তৎপরতার মাধ্যমে সেই দূরত্ব সৃষ্টি করা অনুচিত। জনগণ ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যকার আস্থা ও সংহতি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার এক অমূল্য সম্পদ। এই সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর নয়; সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকেরও। 
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Advertisement