
বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়, এসব সঙ্কটে জনগণ ব্যাখ্যা নয়, চায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, সময়সীমা ও দৃশ্যমান ফল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল না। অনেকের কাছে এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রত্যাশা, যেখানে সরকার মানুষের প্রতি আরো সংবেদনশীল হবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনকে জনজীবনের দৃশ্যমান উন্নয়নে রূপায়ণ করতে সক্ষম হবে।
প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বড় ছিল। একই সাথে এটিও সত্য যে বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি কঠিন অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি পেয়েছে। এসব সমস্যার অনেকগুলো কয়েক মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মানুষ শেষ পর্যন্ত সরকারকে বিচার করে তাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে। তারা চায়, প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহনীয় দাম এবং এমন সরকারি সেবা, যা বাস্তবে কাজ করে।
তাই মানুষ শুনতে চায় না কে কোন সমস্যা তৈরি করে গেছে। তারা জানতে চায়, সমস্যার সমাধানে এখন কী করা হচ্ছে। এর অর্থ অতীত ভুলে যাওয়া নয়। সমস্যার উৎস বোঝা জরুরি, যাতে একই ভুল আবার না ঘটে। কিন্তু একটি সরকার অনির্দিষ্টকাল ধরে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যার ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না।
বিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার পরও লোডশেডিং আছে। এর কারণ একক নয়। গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক কাঠামো, সব কিছুই বিদ্যুতের সরবরাহ ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকের কাছে বিষয়টি আরো সরল। তিনি জানতে চান, সমস্যার সমাধান কবে হবে?
এ কারণে সরকারের প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট তিন ধাপের বিদ্যুৎ নীতি— স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্প মেয়াদে সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে লোডশেডিং যতটা সম্ভব কমানো। উৎপাদনক্ষমতার কতটুকু কাজে লাগছে না, কেন লাগছে না এবং কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা সম্ভব— এসব বিষয়ে পরিষ্কার মূল্যায়ন প্রয়োজন। গ্যাস ও জ্বালানি এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিদ্যমান সক্ষমতার পুরোটা বাস্তবে কাজে লাগানো যায়। প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত শেষ করতে হবে। একই সাথে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সৃষ্ট বাধা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সব ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে দূর করা সম্ভব না হলে অন্তত গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে। অনিশ্চয়তা অনেক সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চেয়েও বেশি ভোগান্তি তৈরি করে। তবে জরুরি ব্যবস্থা স্থায়ী নীতি হতে পারে না।
মধ্য মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবেলা করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়ানো, সিস্টেম লস কমানো, সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজন ও সম্ভাবনা অনুযায়ী দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান এবং বাস্তবসম্মতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ। এর সাথে বিদ্যুতের দাম নিয়েও একটি কঠিন প্রশ্ন রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য কখনো কখনো দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু গ্রাহকের স্বাভাবিক প্রশ্ন, বেশি দাম দেয়ার বিনিময়ে তারা কী পাচ্ছেন? বিদ্যুতের দাম বাড়বে; কিন্তু সরবরাহ বাড়বে না, এমনটি দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সমাধান শুধু মূল্য সমন্বয় নয়। বিদ্যুৎ খাতকে আরো দক্ষ ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা হতে হবে বহুমুখী, স্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামের আকস্মিক পরিবর্তনে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ। দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাতীয় গ্রিডের উন্নয়ন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনা, সব কিছু একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
লক্ষ্য শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়
লক্ষ্য হওয়া উচিত, পরিবার, কৃষি ও শিল্প খাতে প্রয়োজনের সময় নির্ভরযোগ্য ও মানুষের সাধ্যের মধ্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। গ্যাসের সমস্যাকে আলাদা করে দেখা যাবে না। বিদ্যুৎ সমস্যা দেশের সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতি থেকে আলাদা নয়। তাই একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন, বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং আমদানি করা এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানির বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, অর্থ, শিল্প ও পরিকল্পনা— সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। সমস্যাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলে নীতিও বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা যায় না।
জ্বালানির দাম মানেই জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন
এখানেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য, পরিবহন, রান্নার জ্বালানি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের খরচ একই আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
অন্য দিকে ব্যবসা ও শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন ব্যয়ের অংশ। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামেও পড়তে পারে। তাই সরকারের উচিত অল্পসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা।
একটি সহজ নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে
লক্ষ্য কী, দায়িত্ব কার, সময়সীমা কত, অর্থায়ন কোথা থেকে এবং সাফল্য কিভাবে মাপা হবে— প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে। জনগণ জানতে পারবে, লোডশেডিং কতটা কমেছে, গ্যাসের সরবরাহ কতটা বেড়েছে, কত নতুন সঞ্চালন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যচাপ কতটা কমেছে। এতে সরকারও উপকৃত হবে। কোনো নীতি কাজ করলে তার ফলাফল দেখানো যাবে। কোনো নীতি প্রত্যাশিত ফল না দিলে দ্রুত পরিবর্তন আনা যাবে।
গতিশীল নীতিনির্ধারণের অর্থ এটিই— ঘোষিত প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা নয়; বরং বাস্তব ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে নীতি পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখা।
নেতৃত্ব আরো দৃশ্যমান হতে হবে
এখানে নেতৃত্বের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। গতিশীল নেতৃত্ব মানে শুধু বেশি ঘোষণা দেয়া বা বেশি প্রকল্প নেয়া নয়। এর অর্থ হলো দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা, সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করানো। জনগণ যেন বুঝতে পারে, কোন অগ্রাধিকারের জন্য কে দায়িত্বশীল এবং কী অগ্রগতি হয়েছে। প্রত্যেক মন্ত্রীকে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এমন নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি দেখানো।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যচাপ কমানো যদি অগ্রাধিকার হয়, তাহলে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং তার সাফল্য কিভাবে মাপা হবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হয়, তাহলে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।
প্রয়োজনে নীতি পরিবর্তন করতে হবে
কার্যকর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রয়োজনে নীতি পরিবর্তন করার সক্ষমতা। সব নীতি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না-ও করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন হতে পারে, জ্বালানির দাম পরিবর্তিত হতে পারে, আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তাই সরকারকে পরিস্থিতি ও বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি পর্যালোচনা ও সংশোধন করতে সক্ষম হতে হবে। এটি নীতির অস্থিরতা নয়। নীতির লক্ষ্য স্থির থাকতে পারে; কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
ভালো শাসনের অর্থ প্রতিটি সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সেটিকে যেকোনো মূল্যে সমর্থন করে যাওয়া নয়। ভালো শাসনের অর্থ হলো ফলাফল নিশ্চিত করা।
অগ্রগতি স্বীকার, আরো উন্নতির দাবি
একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নও প্রয়োজন। সরকার যেখানে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো স্বীকার করা উচিত। যেখানে সমস্যা রয়ে গেছে, সেগুলোও খোলাখুলিভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। অগ্রগতি স্বীকার করা এবং আরো উন্নতির দাবি করা পরস্পরবিরোধী নয়।
গঠনমূলক সমালোচনা সরকারের বিরোধিতা নয়। এটি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক জনপরিসরের অংশ। মানুষ বুঝতে পারে যে, সরকার কঠিন পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। একই সাথে তারা প্রশ্ন করতেই পারে, সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর কি না। এ ধরনের গঠনমূলক প্রশ্নই বরং নীতিকে আরো কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে।
মানুষকে দেখতে হবে দেশ কোন দিকে যাচ্ছে
সরকারের পক্ষে সব সমস্যার এখনই সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, সেই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের মানুষ বোঝে, দেশের অনেক সমস্যা দীর্ঘদিনের। তারা বোঝে বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি সংস্কারে সময় লাগে। তারা এটিও বোঝে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবকিছু কোনো একটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু তারা দেখতে চায়, দেশটি একটি সুস্পষ্ট দিকে এগোচ্ছে।
এ কারণে সরকার নিয়মিত একটি নীতি ও বাস্তবায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ, লোডশেডিং, গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুতের দাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের অগ্রগতি তুলে ধরা যেতে পারে।
এতে জনগণ যেমন বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পারবে, সরকারও তেমনি নিজের কাজের অগ্রগতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারবে। কোনো নীতি সফল হলে তার ফলাফল দেখানো যাবে। কোনো নীতি কাজ না করলে দ্রুত তা চিহ্নিত করে পরিবর্তন আনা যাবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে একটি নীতিগত পরিবর্তনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। এখন সেই পরিবর্তন দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। বড় বড় ঘোষণার মাধ্যমে নয়; বরং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর সরকারি সেবার মাধ্যমে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত— সমস্যাটি কে তৈরি করেছে তা নয়; বরং এখন কী করা হচ্ছে সেটিই প্রশ্ন।
লেখক : সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, যুক্তরাজ্য









