সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখা যাচ্ছে সহিংসতা, নৃশংসতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের খবর। কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আইফোন নেয়ার জন্য এই হত্যা। তবে এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকার সময় কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্যকে পুলিশে দিয়েছিলেন তিনি।
কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা এখন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে। এখন তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে রক্তক্ষয় হচ্ছে। সামান্য বিষয় নিয়ে আত্মীয়স্বজনের প্রাণহানি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে শিক্ষক কিংবা দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিজের মাকে কুপিয়ে এবং আছাড় দিয়ে আট মাস বয়সী ভাতিজিকে হত্যার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসব আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক নিরাপদ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফেলছে। মানুষের সহজাত সহনশীলতা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে এক চরম মানসিক অস্থিরতা ও সহিংস আচরণ গোটা সমাজকে গ্রাস করছে।
এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পতনের পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন মনস্তত্ত্ববিদরা। সম্পদ ও সুযোগের অসম বণ্টন মানুষকে দিন দিন চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও গভীর হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুবসমাজের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্ব। খেয়ে-পরে থাকতে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। এতে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে তারা। আচার-আচরণে দেখাচ্ছে উগ্রতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। কোনো অপরাধ করার পর দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তি না হওয়ায় অপরাধপ্রবণ মানুষরা দুঃসাহসী হয়ে উঠছে। এতে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। 
অতীতের যৌথ পরিবার প্রথার অবলুপ্তি ও একা শহুরে জীবন মানুষকে নিঃসঙ্গ ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। পারস্পরিক সহমর্মিতা, আপস করার ক্ষমতা কিংবা ‘সমঝোতা’র শিক্ষা আমরা পরিবার ও সমাজ থেকে হারাতে বসেছি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষোভ, কুৎসা ও ঘৃণা ছড়ানোর দ্রুততম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করেই তাৎক্ষণিক এবং আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখানোটা এখন স্বাভাবিক অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। সেই সাথে মাদকাসক্তি ও গ্যাং কালচারের বিস্তার তরুণসমাজকে মানসিক বিষাদে নিমজ্জিত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত বিশাল এক জনগোষ্ঠী কোনো উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে নিজেদের ভেতরে ক্রমাগত ক্ষোভ পুষে রাখছে, তুচ্ছ ঘটনায় যার বহির্প্রকাশ ঘটছে চরম হিংস্রতা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
এই অস্থির অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের প্রয়োজন সামাজিক ও মানসিক কাঠামোর রূপান্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবারের প্রতিটি স্তরে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা পুনরায় শুরু করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও ক্ষতিকর প্রযুক্তি আসক্তি থেকে সরিয়ে আনতে খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে। 
একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়তে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর জরুরি সংস্কার সময়ের দাবি।