
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশবাসী একটি মসৃণ গণতন্ত্র শুরু হওয়ার আশা করে। বিশেষ করে বিপুল আত্মত্যাগের পর রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে রজনৈতিক দলগুলো একমত থাকবে— এ ব্যাপারে সন্দেহ ছিল না; কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেয়ে সরকার গঠনের পর ক্ষমতাসীনরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংস্কারের আগের অঙ্গীকার থেকে সরে যায়। তারা নিজেদের মতো নতুন করে সংস্কার প্রস্তাব আনে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতাসীনদের এমন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। বিরোধী দল জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথে নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত জুলাই সনদে দেয়া তাদের অঙ্গীকারের পুরনো জায়গায় ফিরে আসা।
সংস্কার প্রশ্নে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে গেছে। সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে নিজেদের মতো করে একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদের কাছে উপস্থাপন করবে। এ জন্য তারা ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অন্য দিকে জাতীয় সংসদে এভাবে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে বিরোধী দল প্রত্যাখ্যান করেছে। সংবাদ সম্মেলন করে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে— গণভোটে জনগণের দেয়া রায় বাস্তবায়নের পক্ষে তারা। জুলাই সনদ সরাসরি বাস্তবায়নে জনগণের বিপুল সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছেন তারা।
জুলাই সনদে মূলত বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চার সঙ্কটকে সামনে রেখে সমাধান খোঁজা হয়েছে। বরাবর স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হওয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে তাতে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, ভোটাধিকার সংরক্ষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার উপায় স্থির করা হয় জুলাই সনদে। এগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব পক্ষ মাসের পর মাস আলোচনা করে সংস্কার ও তার পথ-পদ্ধতি স্থির করে। ওই সময় বিএনপি জুলাই সনদকে হুবহু বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তদের পূর্ববর্তী জোরালো অবস্থান থেকে সরে এসেছে। বিচারকদের নিয়োগ-বদলি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল করে তা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যায়। একইভাবে গুম ও মানবাধিকার নিয়ে অধ্যাদেশগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তন আনে, এতে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফ্যাসিবাদী শাসন কাঠামোর জন্য এগুলো ছিল প্রধান হাতিয়ার।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বিশেষ করে বিরোধী দলের ওপর গুম, খুন ও পীড়নের যে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে তা কেউ ভুলে যাওয়ার কথা নয়। মূলত গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ভেঙে দিয়ে এমনটি করতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা। জুলাই সনদ তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ পীড়নের এই চেতনা থেকে। বিএনপির উচিত এই সনদ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় না নেয়া। নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখানো। এখন কোনোভাবে বিএনপি যদি এই সনদকে প্রত্যাখ্যান করে, সেটি দলটির সমর্থকরাও মেনে নিতে পারবেন না।







