
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার ভারতের সাথে বহু চুক্তি ও সমঝোতাস্মারক স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে বা জনপরিসরে আলোচনার সুযোগ দূরে থাক, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাও মতামত দেয়ার সুযোগ পাননি। ভারতীয় পক্ষ নিজেদের সুবিধামতো ধারা ও শর্ত জুড়ে দিয়ে চুক্তি সই করিয়ে নিয়েছে। তখনকার বিনাভোটের সংসদেও এগুলো উপস্থাপন করা হয়নি। হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়নি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তি পর্যালোচনার কথা। দেরিতে হলেও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো ক্ষতিয়ে দেখা জরুরি।
হাসিনা কিভাবে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন তা বোঝার জন্য আদানির সাথে সম্পাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তিটি সামনে রাখাই যথেষ্ট। চুক্তির সব ধারায় আদানির সর্বোচ্চ লাভ ও অন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ যেন নিজে থেকে গলায় ফাঁস লাগানোর অবস্থা। এখন আদানি নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ না করেও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এ চুক্তি থেকে বাংলাদেশ যে সরে আসবে কিংবা চুক্তিতে নতুন পরিবর্তন আনবে— এমন সুযোগও রাখা হয়নি। বর্তমান সরকার ভারতের সাথে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা করছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নয়; দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করা হয়নি। ভারত নিজের স্বার্থে যেসব চুক্তি করতে চেয়েছে, সেগুলোই করা হয়েছে। দেশের প্রধান দু’টি সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা দিয়ে ভারত চুক্তি করে নিয়েছে। দেশের আমদানি-রফতানি সামলাতে বন্দর দু’টি হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকার কারণে দেশের বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে। নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য সামলাতে আরো আন্তর্জাতিক মানের বন্দর আমাদের দরকার। এ অবস্থায় ভারতীয় জাহাজের অগ্রাধিকার সুবিধা দেয়া হয়েছে চুক্তির মাধ্যমে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাত রাজ্যের যোগাযোগ সুবিধার জন্য দেশের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেল সুবিধা নিয়েছে। এ জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের কোনো উপকার নেই; বরং এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ নিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। ট্রানজিট ও করিডোর দিয়ে ভারতকে এভাবে একতরফা সুযোগ দিয়ে উল্টো দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিচার-বিবেচনার সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের অনেক চুক্তি করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে— পর্যালোচনা করে দেশের জন্য ক্ষতিকর শর্তগুলো সরকার চিহ্নিত করছে। সেগুলো দুই দেশের সামনে আলোচনায় উপস্থাপন করা হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত এখন জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য হাসিনার সব চুক্তি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করতে হবে। এগুলো নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। এরপর দেশের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি চিহ্নিত করতে হবে। এ ছাড়া চুক্তি-সমঝোতার যেসব শর্ত ও ধারা দেশের স্বার্থবিরোধী এবং জাতীয় মর্যাদা ও সম্মানের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।







