সচিবালয়ে ফিরেছে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক
সচিবালয়ে ফিরেছে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিবালয়ের ভেতরে পলিথিন ও সিংগেল ইউজ প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই সাথে সরকারি বিভিন্ন দফতরের সভা-সেমিনারও প্লাস্টিকমুক্ত ছিল। ওই সময় এগুলো মনিটরিং করার জন্য একটি টিম গঠন করা হয়েছিল। তখন সচিবালয়ের প্রবেশমুখে তল্লাশি করা হতো। সভা-সেমিনারে কাচের পাত্র, পাটজাত ও কাপড়ের পণ্যের মতো বিকল্প ব্যবস্থা করে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছিল। এই উদ্যোগের পেছনে ছিলেন তখনকার পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এর মাধ্যমে সরকার নিজে উদাহরণ তৈরি করে বেসরকারি খাতকেও উৎসাহিত করতে চেয়েছে।

আশা করা হয়েছিল, সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে তৈরি হওয়া এই শুভ সূচনা পুরো দেশকে প্লাস্টিকমুক্ত করার আন্দোলনে গতি আনবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, কয়েক মাস পর থেকেই শিথিল হতে শুরু করে প্রশাসন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি ফিরে যায় আগের অবস্থায়। সচিবালয়ের ভেতরে ফিরে আসে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক সামগ্রী।

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রের এই অবস্থা পরিবেশ নিয়ে সরকারে আন্তরিকতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কামরা থেকে শুরু করে ক্যাফেটেরিয়ায় এখন জগ, গ্লাস দেখা যায় না। নীতি-নির্ধারণী বৈঠকেও স্থান করে নিয়েছে বোতলজাত পানি ও প্লাস্টিক সামগ্রী। এমনকি কোথাও কোথাও একই প্লাস্টিক বোতলে বারবার পানি ভরে ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ চর্চাও দেখা যাচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি পত্রিকা। 

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ক্ষতি বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি। অপচনশীল এসব বর্জ্য শত শত বছর ধরে মাটিতে থেকে মাটি ও জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি বিনষ্ট করে। প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আমাদের খাবারের শৃঙ্খলে প্রবেশ করে সুপেয় পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে ক্যানসার তৈরি করে। এ ছাড়া শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও হরমোনজনিত মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। 

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সচিবালয়ের ভেতরে এমন প্রশাসনিক শিথিলতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সাথে খতিয়ে দেখা দরকার, এই উদাসীনতা ও শিথিলতার নেপথ্যে বহুজাতিক বোতলজাত পানি ও প্লাস্টিক প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্রচ্ছন্ন প্রভাব কাজ করছে কি না। পরিবেশ রক্ষার জাতীয় এই মহতী উদ্যোগ ভেস্তে দেয়ার পেছনে কারা কাজ করছে বা কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সুযোগ নিচ্ছে, উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে তা খুঁজে বের করা জরুরি।

আমরা মনে করি, কেবল নিষেধাজ্ঞা থাকলেই এই অভ্যাসে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কার্যকর সমাধানের জন্য নির্বাচিত সরকারকে উদ্যোগী হয়ে সচিবালয়কে প্লাস্টিকমুক্ত ঘোষণা করতে হবে। প্রবেশের মুখ থেকে শুরু করে প্রতিটি দফতরে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে প্লাস্টিকের বদলে কাচ, মাটি, পাটজাত বা কাপড়ের তৈরি সুলভ ও মানসম্মত বিকল্প পণ্যের সরবরাহ সহজলভ্য করা জরুরি। প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আমজনতা— সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে অভ্যাসের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। সচিবালয় দেশের প্রশাসনিক নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু। প্লাস্টিকমুক্ত বাংলাদেশের শুরুটা এই কেন্দ্রবিন্দু থেকে হলে এর প্রভাব দ্রুত পড়াটা স্বাভাবিক। এখন সচিবালয়কে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্লাস্টিকমুক্ত করা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত কেবল কাগজে-কলমে রাখলে হবে না। বাস্তবে রূপ দিয়ে সরকারকে তার পরিবেশবান্ধব অঙ্গীকারের প্রমাণ দিতে হবে।