জিন্নাহ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নতুন প্রজন্ম
জিন্নাহ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নতুন প্রজন্ম নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে পরস্পরবিরোধী বহু ন্যারেটিভ। কোথাও তিনি পাকিস্তানের জনক, কোথাও বিভাজনের কারিগর। কোথাও মুসলিম রাজনৈতিক অধিকারের রক্ষক, আবার কোথাও উপমহাদেশের ট্র্যাজেডির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র। 

ভারতে জিন্নাহর একটি নেতিবাচক ভাবমর্যাদা দীর্ঘদিন ধরে প্রবল। এর পেছনে ভারতীয় রাষ্ট্র ও কংগ্রেসপন্থী ইতিহাসচর্চার প্রভাব যে ছিল, তা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। জিন্নাহর সমালোচনার উৎস শুধু ভারত নয়; পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও তাকে নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে— জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক স্থপতি।

তিনি পাকিস্তান দাবি না করলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ঠিক যেরূপে, যে সময়ে এবং যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়েছিল, তার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে ভিন্ন হতো। পাকিস্তান সৃষ্টিতে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সংগঠন, উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, কংগ্রেস-মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, ১৯৪৬ সালের নির্বাচন, কেবিনেট মিশনের ব্যর্থতা এবং ১৯৪৭-এর ত্বরিত ক্ষমতা হস্তান্তর প্রভৃতি ঘটনা মিলেই পাকিস্তানের জন্মের রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি হয়েছিল। আর সেই বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি বড় অংশের জন্য পৃথক রাজনৈতিক সত্তার স্বপ্নকে রাষ্ট্রিক বাস্তবতায় রূপ দিয়েছিল। এখানেই ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর দ্বৈততা। পাকিস্তান ছিল একসময় বাঙালি মুসলিমের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বাতন্ত্র্যের আশ্রয়। আবার সেই পাকিস্তানের ভেতরেই পরবর্তী সময়ে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তীব্র হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পাকিস্তান এক দিকে একটি দরজা খুলেছিল, অন্য দিকে সেই দরজার ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল আরেকটি দরজা খোলার ইতিহাস। আমরা এ ঘটনাটিকে দুটি ‘নেকাব’ বা পর্দার উপমায় দেখতে পারি।

‘প্রথম নেকাব’ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পর্দা। জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তানের জন্ম সেই পর্দার একটি অংশ সরিয়ে দিলো। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি বড় অংশ পেল একটি নিজস্ব পৃথক রাষ্ট্রিক পরিচয়। 
‘দ্বিতীয় নেকাব’ ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের পর্দা। সেই পর্দা সরল এক দিনে নয়। ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আত্মসচেতনতা, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্কট এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই দ্বিতীয় নেকাব সরাতে বাঙালিকে দিতে হয়েছে রক্তের মূল্য। তাই ইতিহাসের এই পরিহাস অস্বীকার করার উপায় নেই। পাকিস্তানের জন্ম বাংলাদেশের জন্মের সরল কারণ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক জন্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্মাণে পাকিস্তান ছিল অপরিহার্য বাস্তবতা, এ সত্যও অস্বীকার করার মতো নয়। 

পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ ঠিক একই ভূগোল, একই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও একই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিতে পারত এ কথা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ছাড়া ১৯৭১-এর বাংলাদেশকে বোঝাও অসম্ভব।

কিন্তু জিন্নাহকে নিয়ে আমাদের সমস্যা হলো আমরা তাকে প্রায়ই সম্পূর্ণ সাদা অথবা সম্পূর্ণ কালো করে দেখি। কিন্তু ইতিহাসের মানুষ সাধারণত এত সরল নয়। জিন্নাহ একসময় হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতারও প্রবক্তা ছিলেন। পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং কংগ্রেসের সাথে তার ক্রমবর্ধমান বিরোধ তাকে পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক রাষ্ট্রের দাবির দিকে নিয়ে যায়। আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তার ১১ আগস্ট ১৯৪৭-এর ভাষণে আমরা এমন এক নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণার সন্ধান পাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

সুতরাং জিন্নাহকে বোঝার জন্য তার রাজনৈতিক জীবনের সব পর্ব একসাথে সামনে রেখে দেখতে হবে। তিনি একই সাথে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা। অন্য দিকে অজান্তে একটি বিভাজনের রাজনীতির বীজ রোপণকারী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে একটি নাগরিকতাভিত্তিক ধারণার প্রবক্তা ছিলেন। এই জটিলতাই তার ইতিহাস।
আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশ জিন্নাহর স্বপ্নের সরল পরিণতি নয়। আবার পাকিস্তানকে বাদ দিয়েও বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না। বাংলাদেশ এসেছে পাকিস্তানের ভেতর থেকে। কিন্তু পাকিস্তানের অনুকরণে নয়। বরং পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালির নিজস্ব জাতীয় আত্মপরিচয় ক্রমে পরিণতি পেয়েছে। এক অর্থে ১৯৪৭ আমাদের একটি রাষ্ট্র দিয়েছিল। আর ১৯৭১ আমাদের সেই রাষ্ট্রের ভেতর থেকে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে।

১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ছিল একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা ছিল একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা। এই দুই স্বাধীনতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটিকে মহিমান্বিত এবং অন্য টিকে অস্বীকার করলে ইতিহাসের কোনো লাভ হয় না। বরং দু’টিকে একই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখতে হবে।
ডাকসু থেকে জিন্নাহর ছবি সরানো নিয়ে সম্প্রতি পক্ষে-বিপক্ষে নানান কথা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু থেকে জিন্নাহর ছবি সরানোর ঘটনাটিকেও শুধু একটি ছবি সরানো হিসেবে দেখলে হয়তো এর গভীর তাৎপর্য ধরা পড়বে না। ছবি কখনো শুধু ছবি নয়। ছবি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক স্মৃতি। ছবি একটি প্রতীক। ছবি কখনো একটি রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার। আবার কখনো একটি প্রজন্মের সাথে পূর্ববর্তী প্রজন্মের বিতর্কেরও চিহ্ন। জিন্নাহর ছবি সরিয়ে দেয়ার ঘটনা একধরনের বালখিল্য ও ইতিহাসচর্চার অভাবজনিত বলে মনে করি। আবার এর মধ্যে হয়তো আরো বড় একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে; নতুন প্রজন্ম কি আর ‘জাতির পিতা’ বা একক ব্যক্তিকে জাতীয় পরিচয়ের একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়? এই প্রশ্নটি শুধু বাঙালির নয়; পাকিস্তানি পরিচয়ের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। একজন মানুষ একটি রাষ্ট্রের জন্মে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু কোনো জাতির ইতিহাস কি শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির জীবনীতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে? সম্ভবত পারে না। 

জাতি তৈরি হয় মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায়। রক্তে, ভাষায়, স্মৃতিতে, সংগ্রামে, সংস্কৃতিতে, ভূগোলে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নে।

বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বা ‘জুলাই স্পিরিট’কে যদি আমরা একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না দেখে একটি নতুন নাগরিক চেতনার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখি, তাহলে তার কেন্দ্রে থাকতে পারে একটি মৌলিক ধারণা। সেটা হচ্ছে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির নয়; রাষ্ট্র নাগরিকের। জাতির ইতিহাস কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির দান নয়। দেশ কোনো ব্যক্তিপূজার বেদি নয়। বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা যেভাবে পুরো দেশকে ব্যক্তিপূজার বেদি বানিয়েছিল নতুন প্রজন্ম সেই ব্যক্তিপূজা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে। সেই পরিত্রাণ এসেছে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত ত্যাগ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাহলে কি জিন্নাহকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হবে? উত্তর হচ্ছে না। বরং তাকে আরো গভীরভাবে পড়তে হবে। তাকে যেমন অন্ধভাবে পূজা করার দরকার নেই, তেমনই রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে তাকে একমাত্র খলনায়ক বানানোও অযৌক্তিক এবং অপ্রয়োজনীয়। জিন্নাহকে পড়তে হবে তার সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। পাকিস্তানকে পড়তে হবে ১৯৪৭ ও ১৯৭১ এর দুই প্রান্তকে একসাথে রেখে। বাংলাদেশকে পড়তে হবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ দুইয়ের আলোকে।
আমাদের দরকার এমন একটি ইতিহাস, যেখানে কোনো জাতির প্রতিষ্ঠাতা মানেই দেবতা নন, আবার কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা মানেই দানবও নন। জিন্নাহকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেতে পারে। তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যেতে পারে। তার রাজনৈতিক দর্শনের সাথে দ্বিমত করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে বুঝতে হলে তার সময়কে বুঝতে হবে। একইভাবে পাকিস্তানের জন্মকে শুধু ট্র্যাজেডি বললে বাংলাদেশের জন্মের ঐতিহাসিক পথটি অস্পষ্ট হয়ে যায়। আবার পাকিস্তানকে শুধু মুসলিম মুক্তির মহাকাব্য হিসেবে দেখলে ১৯৭১-এর রক্তস্নাত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়। ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই। তার ভেতরে একই সাথে বিজয় ও পরাজয়, মুক্তি ও বঞ্চনা, স্বপ্ন ও বিপর্যয় পাশাপাশি থাকে। ১৯৪৭ একটি নেকাব সরিয়েছিল। ১৯৭১ আরেকটি নেকাব সরিয়েছিল। আর আজকের প্রজন্ম হয়তো তৃতীয় একটি নেকাব সরাতে চাইছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাসের নেকাব। সেই নেকাব সরলে হয়তো আমরা দেখতে পাবো জিন্নাহ শুধু পাকিস্তানের নন, তিনি উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাকিস্তান শুধু একটি রাষ্ট্রের নাম নয়, এটি বাংলাদেশের জন্মেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

বাংলাদেশ ১৯৭১ শুধু একটি মানচিত্র নয়। এটি দীর্ঘ আত্মপরিচয়-অন্বেষণের পরিণতি। আর জাতির ভবিষ্যৎ কোনো এক ব্যক্তির হাতে নয় তা জনগণের হাতে। ইতিহাসের কাজ তাই কাউকে দেবতা বানানো নয়। কাউকে দানব বানানোও নয়। ইতিহাসের কাজ হলো নেকাব সরিয়ে সত্যকে যতটা সম্ভব তার জটিল, বহুমাত্রিক এবং মানবিক রূপে দেখা। হয়তো এটাই নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় প্রত্যয়। ব্যক্তির ওপরে জাতি, প্রতীকের ওপরে নাগরিক, আর অন্ধ আনুগত্যের ওপরে সত্য। 

লেখক : সভাপতি, আলীকদম প্রেস ক্লাব, বান্দরবান