
বিদ্যুতের অবস্থা এখন করুণ। গ্রাম-গঞ্জে বিদ্যুৎ অনেক কম থাকে। শহরেও বেড়েছে লোডশেডিং। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানার উৎপাদন।
আমদানিনির্ভর দামি জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। এই খাতে সরকারকে দিতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি। জ্বালানি সঙ্কট ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সৌরবিদ্যুৎ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশের দেশ ভারতে বিশাল বিশাল সোলার পার্ক করা হয়েছে। শিল্প-কারখানায় ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হচ্ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ। এতে তাদের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের খরচও কমে গেছে।
চীন তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানির নেটওয়ার্ক। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে এবং কয়লানির্ভরতা কমাতে তারা প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করছে। ভিয়েতনামে মাত্র দুই-তিন বছরের ব্যবধানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব ঘটে গেছে। তাদের চমৎকার নীতিমালা এবং আকর্ষণীয় শুল্ক কাঠামোর কল্যাণে দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা সহজেই মিটে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে কাজ শুরু করেছে সরকার। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের সুযোগ বাড়াতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দেড় হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণতহবিল দেয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
আমাদের মতো সীমিত ভূমির দেশে আমদানিনির্ভর এলএনজি বা কয়লার ওপর ভরসা করে দীর্ঘমেয়াদে সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি গৃহস্থালি, শিল্পকারখানার ছাদ এবং কৃষি সেচপাম্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে পারি, তাহলে একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে, অন্যদিকে লোডশেডিং ও ভর্তুকি থেকেও মুক্তি পাওয়া সহজ হবে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং এবং সৌরসেচ পাম্পের মতো প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের এই পদক্ষেপ শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্রিন এনার্জি ব্যবহারে ইতিবাচক গতি আনবে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে সহজ শর্তের অর্থায়ন জরুরি ছিল।
তবে মনে রাখতে হবে, অতীতের বহু ভালো উদ্যোগ শুধু আর্থিক অনিয়ম ও তদারকির অভাবে ভেস্তে গেছে। এই বিশেষ তহবিল যেন কোনোভাবেই লুটপাট, দুর্নীতির গ্রাস বা প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক উপহারে পরিণত না হয়। এর আগে বিদ্যুৎ খাতের একাধিক প্রকল্পের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, সুনির্দিষ্ট তদারকি না থাকলে তহবিল স্থানান্তরিত হয় অকার্যকর খাতে। প্রজ্ঞাপনে পুরনো ঋণ পরিশোধ, জমি কেনা বা ব্যক্তিগত ব্যবহারে বারণ এবং বার্ষিক অডিটের যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে— তা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
আমরা মনে করি, অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ধাপ, গ্রাহক নির্বাচন এবং প্রযুক্তি স্থাপনের গুণগত মান কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মাধ্যমে এই অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তা ও সেবাগ্রহীতাদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, জ্বালানি বিদ্যুতের টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে এই ঋণের সুষম ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার করা হবে।







