সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় ছবি: নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য আর জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে দেশের মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবন আজ মারাত্মক সঙ্কটে। উচ্চ দ্রব্যমূল্যের এ বাজারে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নির্মম বাস্তবতার। মাস শুরুর সাথে সাথে সীমিত আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় বাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি বিলের মতো জরুরি ইউটিলিটি খাতে। বাকি সামান্য টাকা দিয়ে পুরো মাস পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানো এখন বলতে গেলে অসম্ভব এক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল, তেলসহ দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতটা আকাশচুম্বী যে, ভালো মানের খাবার কিংবা মাছ, গোশত ও ফলমূল কেনা এ শ্রেণীর মানুষের কাছে এখন স্বপ্নবিলাস। কোনোমতে সস্তার সবজি কিনে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের। এর ফলে শুধু যে জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে তা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে পুরো পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে গুরুতর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি। শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ও চিকিৎসাতেও। সন্তানের পড়ালেখার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক অভিভাবক নিজের অসুখের চিকিৎসাও স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের ব্যবধান দ্বিগুণ হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেকে জমানো সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। তাতেও কুলিয়ে উঠতে না পেরে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন। 
এই আর্থসামাজিক সঙ্কট মধ্যবিত্তকে এক গভীর মানসিক যাতনায় ঠেলে দিচ্ছে। নিম্নবিত্তদের জন্য সরকারিভাবে সাশ্রয়ীমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা থাকলেও সামাজিক আত্মমর্যাদা ও লোকলজ্জার ভয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সেই দীর্ঘ সারিতে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন না। আবার কারো কাছে হাত পাতাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া এই আত্মসম্মানবোধ সমাজে এক নীরব মানসিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার দাবি করা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো সুফল  বা ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, পণ্যের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি, সরবরাহব্যবস্থার কারসাজি এবং সরকারি তদারকি সংস্থার চরম উদাসীনতা এ সঙ্কটের মূল কারণ। ক্ষমতার রদবদল হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু চক্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি; শুধু হাতবদল হয়েছে। তাই পরিসংখ্যানের সাময়িক হ্রাস-বৃদ্ধি দিয়ে সাধারণ মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটানো সম্ভব নয়। যতক্ষণ না বাজারে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর আপসহীন ও কার্যকর অভিযান। 
মূল্যবৃদ্ধি রোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ মানুষের আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি রেখে জীবনযাত্রায় সামঞ্জস্য ফেরাতে হবে। তবে এখনই যে কাজটি করতে হবে, তাহলো বাজার সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। তা না হলে  দেশের সামাজিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারী এই বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়বে। এতে সমাজে দেখা দিতে পারে চরম বিশৃঙ্খলা।