‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত
‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত ছবি: নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা কোনো সিন্ডিকেট চাই না, সুষ্ঠু শ্রমবাজারের পরিবেশ চাই। সমস্যা শুধু মালয়েশিয়ায় নয়, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বেশি হচ্ছে। 

তিনি বলেন, বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশী নাগরিক দুবাই গেলে তাকে বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশে ফেরত দিচ্ছেন সেখানকার সরকারি কর্মকর্তারা। কোনো কারণও ব্যখ্যা করা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে ভিসা অকার্যকর। নাগরিকরা এভাবে ফিরে আসবেন তা শুধু চাকরির অধিকার হরণ নয়, দেশকে অপমানের শামিল। এই ফিরে আসার পিছনে নিশ্চয়ই কিছু কারণ আছে। সেই কারণগুলো সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। সপ্তাহের সপ্তাহ গড়িয়ে গেলেও সমাধান না হওয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। 

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলরুমে ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, কিছু ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠী আছে তারা ঘুষ ও মানুষের ওপর জুলুম ছাড়া বাঁচতে পারে না।  কিন্তু জাতি তাদের কাছে অসহায় হয়ে আত্মসমর্পণ করার প্রশ্নই উঠে না। বাঙালি বীরের জাতি, তাদের লড়াই করে নিজের অধিকার আদায় করতে হবে। 

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যতগুলো ওয়াদা দিয়েছিল, তার সবগুলো অবলীলায় অস্বীকার করছে, উল্টো পথে চলছে। গণভোটের আহ্বান জানানোর পর এখন মানবে না, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে বলেছিল, এখন কিছুই করবে না। স্বাধীন বিচার বিভাগে এখন তালা লাগিয়েছে, দুদক, মানবাধিকার কমিশন ও নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না করে দলীয় কর্মীকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।  

তিনি আরো বলেন, প্রবাসীদের অধিকার না দিয়ে শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলা উপহাসের শামিল। আমরা লড়াই করেছিলাম প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেয়ার জন্য, আমরা সফল হয়েছি। কিন্তু এ লড়াইয়ে আমরা বিএনপিকে পাইনি। বরং, প্রবাসীদের ভোট লাগবে কেন- এমন উল্টাপাল্টা কথা তাদের অনেক নেতাকর্মী বলেছেন। আমরা বলেছিলাম প্রবাসীদের ভোটাধিকার না দেয়া পর্যন্ত এবারের নির্বাচন হবে না। 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তিনবার বন্ধ হয়েছে। উন্মুক্ত হওয়ার পর চতুর্থবার বন্ধ হোক- তা আমরা চাই না। এটি দেশের জন্য অপমানজনক। মালয়েশিয়ার ফ্যাসিস্ট আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো সচল আছে। ভেতরের রূহ ঠিক আছে শুধু বাইরের চাদর বদলানো হয়েছে। একদল গেছে, আরেক দল দায়িত্ব নিয়েছে- তাদের বোঝাপড়া আছে। এই সিন্ডিকেটে আমার ভাই থাকলে তাকেও বের করে দেন। আমরা কোনো সিন্ডিকেট চাই না।

তিনি বলেন, আমরা সিন্ডিকেটের জুলুম আর চাই না। সরকারকে বলব এসব বন্ধ করুন। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা পারলে বাংলাদেশকেও পারতে হবে। আমরা শুনতে পেরেছি কোনো কোনো নেতা সিন্ডিকেটের সদস্যদের সাথে বৈঠক করেছেন। চব্বিশের পরে মানুষের ওপর জুলুম বহাল থাকবে তা কল্পনাও করি নাই। যারা বড় বড় কথা বলেন তারাই এখন এসবের সাথে যুক্ত। 

জামায়াত আমির বলেন, আমরা সাত দফার দাবিতে মাঠের আন্দোলনে আছি। আগামীতে শ্রমিকদের অধিকারের দফা যুক্ত করে আটদফা করব। এসব জনগণের দাবি- কোনো গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তির দাবি না কিংবা কাউকে বসানো ও সরানোর দাবি না। বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। এই দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না। আমরা নিশ্চিত ও আস্থাশীল জনগণের বিজয় হবে। আমরা সরকারি দল ও বিরোধীদল-কারো বিজয় চাই না, বিজয় চাই জনগণের।

তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতি জনগণের জন্য, দেশের জন্য, নিজের জন্য নয়। আমরা দেশে সে রাজনীতিটাই বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা যেমন উশৃঙ্খল বিরোধী দল হতে চাই না, কলঙ্ক লেপন করতে চাই না এবং আমার মহান আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে অনুগতও হব না। সঠিক জায়গায় কথা বলব এবং যা উচিৎ তাই বলব। 

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মাধ্যমে জনগণের কথা বলা বন্ধ করার চেষ্টা করা হলে তাতেও বাধা দেবো। যদি দেখি মুক্ত কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য আইন করা হচ্ছে- তাহলে তা মানব না। 

তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে চাই মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হোক। তবে অসৎ কোনো ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান যেন তাতে সুবিধা না পায়। ২৫টি অ্যাজেন্সিকে সিলেক্ট করে তাদের অধীনে অন্য অ্যাজেন্সিকে কাজ করার ব্যবস্থা এবং আগের অভিজ্ঞতা না থাকা অ্যাজেন্সিকে সিলেক্ট করার সমালোচনা করেন তিনি। 

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নিশ্চয়ই সরকারের সাথে জড়িত আছে তারা। না হলে এটি করে কিভাবে। সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে যে, তারা জড়িত নয়। পরিষ্কার করতে হবে কোন যোগ্যতায় তাদের সিলেক্ট করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, জনগণের দাবি, কাজের প্রয়োজনে মানুষ বিদেশে যাব, সরকার যেন শোষণের হাতিয়ার না চালায়। আমরা এটি আর দেখতে চাই না। সব স্পষ্ট থাকতে হবে। সরকারের প্রতি যত সহযোগিতা লাগে তা বিরোধী দল করবে। কিন্তু বর্তমানটি ধরে রেখে জনগণকে শোষণের চেষ্টা করা হলে এটি দুঃসংবাদ হয়ে তাদের দিকে ফিরে যাবে। জনগণের জন্য দুর্বার আন্দোলন করে এ সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করব। 

তিনি আরো বলেন, শুধু শ্রমবাজার না, বাংলাদেশে বাজার সিন্ডিকেটও আছে। আমরা সরকাকে বাধ্য করব এসব ভাঙতে। সরকার না পারলে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। জনগণের সহযোগিতা পেলে এসব সিন্ডিকের অস্তিত্ব আমরা কোথাও রাখব না। সিন্ডিকেটের চক্র থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে হবে। আমরা লড়াই ত্যাগ করব না। বায়রার সদস্যদেরও মাঠে নামতে হবে। সবাইকে এগিয়ে এসে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবে আমরা সমাজে শান্তি চাই বিশৃঙ্খলা চাই না। জনগণের রক্ত চুষলে বসে বসে আঙ্গুল চুষব না। আমাদের কাজ আমরা ঠিকই করব। সব জায়গায় শোষণ, কোনো পরিবর্তন হয়নি। জনগণ ভালো না থাকলে দেশ ভালো থাকবে না। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক সাবেক কূটনৈতিক সাকিব আলী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতাহারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কাশেম কাশেমী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, এবি পার্টির শ্যাডো অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মো: ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান প্রমুখ। 

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য মো: নেয়ামুল বশির, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম তালুকদারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতা ও জাতীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।