
জীবনের ২৩টি বসন্ত কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালে। সাধারণ ক্ষমায় কারাদণ্ড মওকুফ হলেও কেবল ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড পরিশোধের সামর্থ্য না থাকায় কারামুক্তি আটকে ছিল চা-শ্রমিক নাইটু রাজু মুণ্ডার (৫০)।
অবশেষে এই সহায়-সম্বলহীন রাজুর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন। নিজের উদ্যোগে অর্থদণ্ডের পুরো টাকা পরিশোধ করায় দীর্ঘ ২৩ বছর পর মুক্তির স্বাদ পেলেন রাজু।
রোববার (৮ নভেম্বর) সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে তিনি মুক্তি পান।
যেভাবে এলো মুক্তির সুযোগ
জানা যায়, জেল কোডের ৫৬৯ বিধান অনুযায়ী, ২০ বছর সাজা ভোগের পর মানবিক বিবেচনায় মুক্তির সুযোগ থাকায় রাজুর পক্ষে আবেদন করা হয়। পরে তার কারাদণ্ড মওকুফের আদেশ আসে। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে মুক্তি আটকে যায়। পরিবারের পক্ষেও এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না।
আইনশৃঙ্খলা সভায় মানবিক উদ্যোগ
বিষয়টি জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় তুলে ধরেন সমাজসেবা অধিদফতরের প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী।
সভায় উপস্থিত নাসিম হোসাইন অসহায় চা-শ্রমিকের মুক্তির বিষয়টি শুনে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থদণ্ডের ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের দায়িত্ব নেন। সভা শেষে তিনি টাকা পাঠিয়ে দেন এবং দ্রুত রাজুর মুক্তির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।
প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী জানান, রাজুর মুক্তির জন্য একজন দাতা খুঁজছিলেন তিনি। কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করেও সফল হননি। পরে জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি তুলে ধরলে নাসিম হোসাইন সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তাকে কারাগারের ফটকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি সেখানে যেতে চাননি। বরং দ্রুত রাজুর মুক্তির ব্যবস্থা করার কথা বলেন। মুক্তির পর রাজু তার সঙ্গে কথা বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
কারাকর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক বলেন, ‘একটি হত্যা মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০০৩ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন নাইটু মুণ্ডা রাজু। জেল কোডের ৫৬৯ বিধান অনুযায়ী ২০ বছর সাজা ভোগের পর মানবিক বিবেচনায় তার মুক্তির আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তির আদেশ এলেও অর্থদণ্ডের টাকা পরিশোধ না হওয়ায় তাকে ছাড়া সম্ভব হচ্ছিল না। অর্থদণ্ড পরিশোধের ব্যবস্থা হওয়ার পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও রাজুর আকুতি
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাসিন্দা রাজু স্থানীয় একটি চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিয়ে করেননি তিনি। দীর্ঘ কারাবাসে আপনজনদের সাথে সম্পর্কও অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যে হত্যা মামলায় তার সাজা হয়েছিল, সেই ঘটনার স্মৃতিও এখন অনেকটা ঝাপসা।
মুক্তির পর নিজের অতীত নিয়ে আক্ষেপের চেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই বেশি তার কণ্ঠে। রাজু বলেন, ‘ভুলের মাশুল তো জেল খাটলাম। পাপ মুছেছে। এখন সামনের দিনটা ভালো করে কাটাতে চাই।’
আবার চা-শ্রমিকের কাজ করবেন কি না, জানতে চাইলে কিছুটা হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘সঙ্গীসাথি কেউ তো আর নাই। জেলে যে কাজ (বাবুর্চি) করছি, সেইটাই করার চেষ্টা করমু।’
২৩ বছর পর মুক্তি মিললেও রাজুর জন্য অপেক্ষায় নেই আপনজন, নেই ফিরে যাওয়ার মতো কোনো পারিবারিক আশ্রয়। তাই কারাগারের বাইরে নতুন জীবনে তার ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজু বাবুর্চির কাজ করতে চাইলে তাকে কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় কাজের ব্যবস্থা করে দেয়ার চেষ্টা করবেন। দীর্ঘ বন্দিজীবনের পর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








