পাহাড়, চট্টগ্রাম
গত চার দশকে অবাধে পাহাড় নিধনের ফলে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ১২০টি পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। সংগৃহীত

পাহাড়, নদী ও সাগরের সমন্বয়ে এক অনন্য ভৌগোলিক মানচিত্র নিয়েই একসময় গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম। এর সবুজ পাহাড়ের সারি, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরকে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু গত চার দশকে অবাধে পাহাড় নিধনের ফলে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ১২০টি পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। এতে একের পর এক পরিবেশগত সঙ্কটে পড়ছে নগরবাসী।

Advertisement

গত চার দশকে মানুষ পাহাড় কেটে মাটি অপসারণ ও সমতল করে সেখানে বহুতল ভবন, আবাসন প্রকল্প ও রাস্তাঘাট বানিয়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহলের পাহাড় কাটা অব্যাহত ছিল। 

পরিবেশ গবেষকরা বলছেন, পাহাড় হারানোর এই ক্ষতি এখন আর পাহাড়ের গায়ে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রীষ্মে অতিরিক্ত দাবদাহ, বর্ষায় পাহাড়ধস, বৃষ্টিতে নগর ডুবে যাওয়া—চট্টগ্রামের মানুষকে ঘিরে ধরছে একের পর এক পরিবেশগত সঙ্কট। তাপমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, সবুজ ও জলাভূমি কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পাহাড় কাটার সম্মিলিত প্রভাব বদলে দিচ্ছে নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। প্রকৃতির আক্রোশে পড়ে তার মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষকেই—কখনো প্রাণ দিয়ে, কখনো ঘরবাড়ি হারিয়ে, কখনো পানিবন্দী থেকে।

Advertisement

চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালী ও পাহাড়তলী—এক সময় এসব এলাকার বহু জায়গায় চোখে পড়ত পাহাড়ের সারি। কোনো পাহাড়ের গায়ে ছিল গাছপালা, ঝোপঝাঁড় ও প্রাকৃতিক সবুজ; কোথাও ছিল উঁচু-নিচু টিলার বিস্তার। এখন এসব এলাকার অনেক জায়গায় পাহাড়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনো কোনো স্থানে পাহাড়ের কেবল একটি অংশ অবশিষ্ট আছে—চারপাশে কেটে সমতল করা হয়েছে, নির্মাণ করা হচ্ছে ঘরবাড়ি।

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের ২০২২ সালে করা একটি জরিপে দেখা গেছে, আশির দশকে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ২০০টি পাহাড় ছিল। চার দশকের ব্যবধানে নগরীতে পাহাড় অবশিষ্ট ছিল ৮০টির মতো, বাকি ১২০টি বিলীন হয়ে গেছে। 

পাহাড় কীভাবে নিধন হয়েছে তাও সেই জরিপে দেখানো হয়। নগরায়ণের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান আবাসনের চাহিদা, সড়ক নির্মাণ, সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং মাটি বাণিজ্যের সরাসরি আঘাত পড়েছে পাহাড়ে। জনসংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে বসতি ও অবকাঠামোর চাপ। সেই চাহিদা মেটাতে পাহাড়ে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন, পাহাড় কেটে মাটি নেওয়া হয়েছে ইটভাটা ও বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য; কোথাও পাহাড়ের ঢাল সমতল করে তৈরি হয়েছে প্লট। কোথাও ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের জন্য কাটা হয়েছে পাহাড়। 

বিগত সময়ে সরকারি প্রকল্পেও পাহাড় কাটার হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নগরীর বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫টি পাহাড় কেটেই। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আপত্তি জানানোর পরও তা থামানো যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে ভূমি জরিপের ভুল শ্রেণিবিন্যাসও পাহাড় রক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পাহাড় হলেও সরকারি নথিতে কোথাও ‘নাল’, কোথাও ‘বাগান’, কোথাও ‘বাড়ি’ কিংবা অন্য শ্রেণির জমি হিসেবে উল্লেখ থাকায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হয়ে পড়ে।

পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক উপাদান কমে গেলে নগরের তাপ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। চট্টগ্রামেও দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। সিটি করপোরেশন এলাকার ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে গড় বার্ষিক বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। 

একই গবেষণায় জুন-আগস্ট মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা আরও বেশি—প্রায় ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বার্ষিক গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা প্রায় ১.৫ শতাংশ কমার প্রবণতার কথাও বলা হয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, চট্টগ্রামে এখন শীতের বিস্তার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গ্রীষ্মের তীব্র গরমের পাশাপাশি শরৎ ও হেমন্তের দিনেও গরমে অস্বস্তি বাড়ছে।

চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস আর প্রাণহানি এখন নিত্যকার ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ৩৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

পাহাড়ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। টানা বৃষ্টির মধ্যে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি চাপা পড়ে প্রাণ হারান ১২৭ জন। একদিনের এই বিপর্যয় চট্টগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। 

প্রাণহানির পরিসংখ্যানের বাইরেও ঝুঁকির মাত্রা বড়। একই প্রতিবেদনে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারী ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবারের কথা বলা হয়েছে। এসব পরিবারের অনেকেই কম আয়ের কারণে পাহাড়ের ঢাল কিংবা পাদদেশে বসবাস করেন।

বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের বহু সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে ডুবে যায়। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও যানবাহন অচল, কোথাও দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এখন পরিচিত দৃশ্য। 

নগরীর দীর্ঘ স্থায়ী জলাবদ্ধতাজনিত জনদুর্ভোগ ও বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির পেছনে অন্যতম কারণও পাহাড় কাটা। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএসহ তিনটি সংস্থা মোট ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, ইতোমধ্যে ১০ হাজার ৪০০ কোটির বেশি টাকা খরচ হলেও সুফল পাওয়া যায়নি। বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পের অধীনে খাল পুনঃখনন, দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নালা-নর্দমা উন্নয়নের পর সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে সত্যিকারের সুফল মিলবে না।

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। খাল সংস্কার, নালা নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নসহ নানা প্রকল্প নেয়া হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। এই সঙ্কটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে পাহাড় কাটাও একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন গবেষকরা। পাহাড় কাটার কারণে বৃষ্টির পানিতে মাটি ধুয়ে নিচে নেমে এলে নালা-খাল ও অন্যান্য প্রবাহে পলি জমা হয়। এতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর অভিযান চালিয়ে মামলা ও জরিমানা আরোপ করলেও দস্যুদের দমানো যাচ্ছে না। এখনো চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, বায়েজিদ পাহাড়তলী এলাকায় নানা কায়দায় দস্যুরা পাহাড় নিধন করে চলেছে। 

২০০৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর পাহাড় ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপত্তা, পাহাড় কাটা বন্ধ, দখল নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়। বিভিন্ন সময়ে কমিটির সভায় পাহাড় রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সুপারিশ এসেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়।

পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়গুলোকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে নজরদারি করছে ব্যবস্থাপনা কমিটি। গত জুলাই মাসে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩২তম সভায় নগরের পাহাড়গুলোর বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতির তালিকা হালনাগাদ, পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, অভিযান জোরদার এবং প্রতি তিন মাসে কমিটির সভা করার সিদ্ধান্ত হয়।

পরিবেশ অধিদফতর, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক জমির উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘দেশের ১৬টি জেলায় পাহাড় আছে; যার সিংহভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। আমরা পাহাড় কাটার কোনো তথ্য পেলেই আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সেটা সরকারি প্রতিষ্ঠান হোক আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোক। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটা হচ্ছে কক্সবাজারে। আমরা তথ্য পেলেই মামলা করছি, জরিমানা করছি।’

পরিবেশ অধিদফতর, চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়গুলো রক্ষা করার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি। পরিবেশবাদী সংগঠন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সবার সহযোগিতায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে মহানগরীর পাহাড়গুলোকে পাঁচটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। কমিটিতে পরিবেশসহ ওয়াসা, সিডিএ, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ সব বিভাগের প্রতিনিধিত্ব আছে। কমিটি নিয়মিত মনিটরিং করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত আমরা প্রায় ৭৪টি অভিযান পরিচালনা করেছি। প্রায় ৬৯ লাখা টাকা জরিমানা আদায় করেছি। এছাড়া নিয়মিত ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নিয়মিত অভিযান, মনিটরিং, মামলা ও জরিমানায় পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে পাচ্ছি। দলবদ্ধভাবে পাহাড় কাটা প্রায় বন্ধ হয়েছে। এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাহাড় কাটা বন্ধ করা চ্যালেঞ্জ।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান ড. মো: জিয়াউদ্দীন বাসসকে বলেন, ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের পর থেকেই পাহাড় রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। গত দুই বছর ধরে আমরা একটা পরিবর্তন এনেছি; সেটা হলো পাহাড় কাটা হয় ছুটির দিনে কিংবা রাতে। এটা ঠেকাতে আমরা মহানগরকে পাঁচটা জোনে ভাগ করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। খবর পাওয়া মাত্রই তা প্রতিরোধ করা হচ্ছে। সমন্বয়ের অভাবে পরিবেশ অধিদফতরের যে দুর্বলতাটা ছিল, সেটা দূর হওয়ায় এখন পরিবেশ অধিদফতরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারছে।’

সূত্র : বাসস