পিটিয়ে হত্যা
ডিমলায় সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে পিটুনিতে মায়ের মৃত্যু, আটক ৪। নয়া দিগন্ত

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় যৌতুকের জমির দখল ও ফসল কাটা কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে মোসাম্মৎ মিনা বেগম (৩৫) নামের এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিজ সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে হামলাকারীদের লাঠির আঘাতে ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে প্রাণ হারান ওই মা।

Advertisement

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলি এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর ডিমলা থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চারজনকে আটক করেছে।

নিহত মিনা বেগম উত্তর সোনাখুলি এলাকার মো: জামিনুর রহমানের স্ত্রী।

আটক চারজন হলেন—একই উপজেলার উত্তর সোনাখুলি গুচ্ছগ্রাম এলাকার আমেতুল্লাহ মুন্সির ছেলে সামছুল হক (৬৫), মো: আয়নাল হকের ছেলে সবুজ (২৮), আয়নাল হকের স্ত্রী মোছা: ছবিরন (৫০) এবং মো: আয়নাল হকের মেয়ে রাহেনা বেগম (২৫)।

বিয়ের পর যৌতুকের জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত মিনা বেগমের ছেলে মিলনের (২৬) সাথে আয়নাল হকের মেয়ে মোছা: হামিদা বেগমের (২২) বিয়ে হয়। বিয়ের সময় কাবিন ও যৌতুকের অংশ হিসেবে একটি জমি বন্ধক রেখে জামাই মিলনকে চাষাবাদের জন্য দেন শ্বশুর আয়নাল হক। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই বন্ধকি জমির দখল, চাষাবাদ এবং সাংসারিক নানা বিষয় নিয়ে জামাই ও শ্বশুরালয়ের লোকজনের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়।

পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে সালিশে বসেন। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, বিতর্কিত জমিতে থাকা বর্তমান ধান কাটা শেষ হলে পুনরায় বসে স্থায়ী সমাধান করা হবে।

সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের করুণ পরিণতি

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, আজ বিকেলে গবাদি পশুর খাদ্য (ছুট ধানগাছ) কাটার উদ্দেশ্যে মিলনের ছোট ভাই মস্তো মিয়া (১৪) উক্ত জমিতে যায়। এ সময় আয়নাল হক ও তার ছেলে সবুজসহ কয়েকজন মস্তোর ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর শুরু করে।

ছোট ছেলের কান্নাকাটি ও চিৎকার শুনে মা মিনা বেগম তাকে রক্ষা করতে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এতে হামলাকারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে মিনা বেগমের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। হামলাকারীদের লাঠির সশরীরে মারাত্মক আঘাতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন এবং মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন মিনা বেগম।

হাতেনাতে ৪ ঘাতক আটক

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা মো: ছামিদুল ইসলাম (৩৫) ও গোলাম মোস্তফা (৪৫) জানান, মিনা বেগমের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও অভিযুক্ত ৫ থেকে ৭ জন জমির ধান কাটতে থাকে। পরে স্থানীয় জনতা ধান কাটায় রত অবস্থায় চারজনকে হাতেনাতে আটক করে। খবর পেয়ে ডিমলা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অভিযুক্ত চারজনকে থানায় নিয়ে যায়।

পুলিশি পদক্ষেপ ও আইনানুগ ব্যবস্থা

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত চারজনকে আটক করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে যৌতুকের জমি ও ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।’

নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পলাতক অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না।’