
নীলফামারীর সৈয়দপুরে তৈরি হচ্ছে গৃহস্থালি কাজের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ ঝাড়ু। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একজন উদ্যোক্তার হাত ধরে তা বিদেশেও রফতানির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আর এই কাজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে কয়েকজন হতদরিদ্র ও ভবঘুরে মানুষের। ফলে বেকারত্ব ঘুচে সংসারের হাল ধরার উপযোগী হয়েছেন তারা। এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো অনেকে এধরণের পণ্য নিয়ে ক্ষুদ্র হস্তশিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে শহরের সাহেবপাড়ায় রেলওয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটা পরিত্যক্ত রেলওয়ে কোয়াটারের সামনে ফুল ঝাড়ু তৈরির কাজ করছেন কয়েকজন। কেউ ফুল গুছিয়ে মুঠো করে বাঁধছেন, কেউ তার সাথে পাটকাঠি লাগাচ্ছেন, কেউ পাটকাঠি দিয়ে তৈরি রোল কেটে সমান করছেন। আবার কেউ ঝাড়ুর হাতলে কচটেপ পেচাচ্ছেন। এভাবে তিন-চার হাত ঘুরে সম্পূর্ণ হচ্ছে ঝাড়ু বানানোর কর্মযজ্ঞ।
তাদের কাছে জানা যায়, ঝাড়ু তৈরির এই কারখানার নাম ‘আরব ট্রেডার্স অ্যান্ড কুটির শিল্প।’ এর উৎপাদিত পণ্য ‘গ্রাম বাংলা ঝাড়ু।’ এটি ‘আর এস এন্টারপ্রাইজ’ -এর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান। ঝুট কাপড় থেকে পোশাক তৈরিকারীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ রফতানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প মালিক সমিতি’ -এর সাংগঠনিক সম্পাদক ফাইয়াজুল হক সাজু এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
এখানে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে এক হাজার পিস বিভিন্ন সাইজের ও মডেলের ঝাড়ু তৈরি হয়। এজন্য সাত-১০ জনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে হতদরিদ্র বেকার লোকজনের কাজ করে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সাথে নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রও সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার তৈরি ঝাড়ু সৈয়দপুরের বাজারসহ আশেপাশের এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগামীতে এগুলো বিদেশেও যাবে বলে প্রত্যাশা উদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজুর।
কারখানার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন সৈয়দপুর শহরের বাঙালীপুর নিজপাড়া এলাকার মো: লিটন সরকার (৫৫)। তার দুই ছেলে মো: পারভেজ (২৮) ও মনিরুল ইসলাম (১৮) সহযোগী হিসেবে কাজ করে এখানে। তারা ঝাড়ুর হাতলে পাটকাঠি লাগানো ও তার দিয়ে বাঁধার কাজে নিয়োজিত। এছাড়াও একজন ছিন্নমূল নারী পুতুল (৩৮) পাটকাঠি থেকে ময়লা ছাড়ানোর কাজ করেন। আরো চারজন দরিদ্র যুবকও আছেন কর্মী হিসেবে। তারা তার ও কচটেপ পেচিয়ে ঝাড়ু তৈরির কাজ সম্পন্ন করেন।
সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালীপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর পীরপাড়া এলাকার নুর ইসলামের ছেলে নুরনবী বলেন, ‘আমি আগে বেকার ছিলাম এবং ঘুরে বেড়াতাম। এখন এই কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছি। অনেকে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকাও আয় করছেন। সাজু স্যার ধরে এনে ভালো কাজে লাগিয়েছেন। তার জন্য আমি এখন বাবা মায়ের সাথে সংসারের হাল ধরতে পেরেছি। এখন আর না খেয়ে থাকতে হয় না।’
একইভাবে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে পুতুল বলেন, ‘এভাবে কাজ করে যে টাকা পাবো কখনোই ভাবতে পারিনি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে চেয়ে খেতে হতো। কখনো খেতে পারতাম, কখনো না খেয়েই দিন কাটতো। একটু পাগলির মতোন হওয়ায় ভারি কাজ করতে পারি না তাই হোটেলে বা বাসা বাড়িতেও কাজ পাইতাম না। এখন আরামের কাজ পাইছি। প্রতিদিন ৩০০-৫০০ টাকা পাই। এজন্য সাজু স্যারকে অনেক দোয়া করি।’
উদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু বলেন, ‘আমরা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোর ফেলে দেয়া ঝুট কাপড় এনে সৈয়দপুরে পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছি। ঘরে ঘরে এসব গার্মেন্টস কারখানা। এতে যেমন হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তেমনি ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাক, ব্যাগসহ অন্যান্য পণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এরই অংশ হিসেবে নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে আমি সদা সচেষ্ট। এজন্যই কুমিল্লায় এই ঝাড়ু তৈরির কারখানা দেখে এবং বিস্তারিত জেনে ও শিখে কার্যক্রম শুরু করেছি। সুদূর রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি থেকে ফুল সংগ্রহ করে স্থানীয়দের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছি। বিশেষ করে যে ছেলেরা কর্মহীন হয়ে ঘুরে বেড়াতো এমন দরিদ্রদের এনে কাজে নিযুক্ত করেছি। এতে কর্মসংস্থান পেয়ে তারা বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে ঝাড়ু তৈরিতে পাটকাঠি ব্যবহার হওয়ায় পাটচাষিদের ফেলে দেয়া জিনিস কাজে লাগছে। সেই সাথে স্থানীয় বাজারে স্বল্পদামে ঝাড়ু বিক্রির পথ সুগম হয়েছে। আগে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম থেকে তৈরি ঝাড়ু এনে আকার ভেদে ন্যুনতম ৮০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতো ব্যবসায়ীরা। অথচ লাভ হইতো কম। এখন সেখানে ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন এবং লাভও হচ্ছে বেশি। এতে ভোক্তাদেরও সাশ্রয় ও সুবিধা হয়েছে। ইতোমধ্যে সৈয়দপুরসহ রংপুর বিভাগের সব জেলায় এই ঝাড়ু বিক্রি ব্যাপকভাবে হচ্ছে।’
সাজু বলেন, ‘এখন এধরণের আরো বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের সার্বিকভাবে সহযোগীতা করার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির চেষ্টা করছি। তাদের উৎপাদিত পন্য দেশের বাজারে বিক্রির ব্যবস্থার পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছি। কিছু দিনের মধ্যে আমাদের তৈরি ঝাড়ু সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে পাঠানো শুরু হবে। এই পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নাই এবং সারাবছরই ব্যাপক চাহিদা আছে। তাই এক্ষেত্রে সফল হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা আছে।’
সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীসহ আগ্রহীদের এমন ক্ষুদ্র হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








