ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে মিঠাপুকুরের বাতাস

শাহীন মণ্ডল মিঠাপুকুর (রংপুর) 
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ইটভাটা। যার মধ্যে ৩৩টিরই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ইটভাটাগুলোর বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠছে উপজেলার বাতাস। 
প্রায় ৫১৫ দশমিক ৬২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় প্রতি ২০ বর্গকিলোমিটারে অন্তত একটি করে ইটভাটা অবস্থান করছে। প্রায় সব ক’টি ভাটাই গড়ে উঠেছে জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও ফসলিজমির ওপর। নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠছে নতুন নতুন ভাটা। এসব ভাটার ধোঁয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন উপজেলার ছয় লক্ষাধিক মানুষ। 
রংপুর মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাতাসে দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বড় ধরনের শিল্পকারখানা না থাকলেও যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা ইটভাটার কারণে অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে আশপাশের বায়ুমণ্ডল। বায়ুমান সূচকে রংপুরের দূষণমাত্রা সম্প্রতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বায়ুমান শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ধরা হলেও মিঠাপুকুরে চলতি মাসে তা রেকর্ড করা হয়েছে ২১৬, যা মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। 
রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, এই উপজেলায় কলকারখানা না থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত ইটভাটার কারণে দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, তীব্র তাপদাহ, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বৈরী আচরণ ঘনঘন দেখা দিচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগে এক হাজার ১৮টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ১৫১টি বৈধ। বাকি ৮৬৭টি ইটভাটা চলছে অবৈধভাবে। এর মধ্যে রংপুর জেলাতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি- ২৪০টি ভাটার মধ্যে ছাড়পত্র আছে মাত্র ২৮টির। সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে অধিকাংশ ভাটায় ইট পোড়াতে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার চলছে। আবার ইট তৈরির জন্য মাটি তোলা হচ্ছে স্থানীয় নদ-নদী ও আবাদি জমি থেকে। কাঠের চাহিদা মেটাতে উজাড় করা হচ্ছে গাছপালা। প্রভাবশালীদের এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, অথচ নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন দেখা যায়, তিন ফসলি কৃষিজমিতে ভাটার ছাই ও ধুলাবালু জমা হয়ে আবাদ নষ্ট হচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে নদ-নদী থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বালু তোলা হচ্ছে। ফলে নদীপাড়ের জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। বড়বালা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, যমুনেশ্বরী নদীর পাশেই তার জমি। প্রতিনিয়ত নদীর বালু তোলায় এবং জমিতে বালুর আস্তরণ পড়ায় ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। 
এ ছাড়া স্থানীয় শিক্ষার্থীরা জানান, সকালে বাইরে বের হলেই ধুলাবালু ও ভারী ধোঁয়ায় স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও মিলছে না সমাধান। অন্য দিকে পরিবেশ অধিদফতর লোকবল সঙ্কটের অজুহাত দিচ্ছে, আর কৃষি বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ এসব ইটভাটা বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 
বায়ুদূষণের ফলে শিশু ও বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষের মধ্যে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা জটিলতা বাড়ছে। মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেবুল আলম বলেন, ইটভাটা ও উন্নয়নকাজে সৃষ্ট ধুলাবালু বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। এর ফলে নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও সিওপিডি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে দ্রুত কার্যকর প্রতিকার প্রয়োজন।