আবদুল আল-সাইয়িদ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর, মিশিগান সিনেট নির্বাচন, সারাহ জুকাকু, আবদুল আল-সাইয়িদের বিজয়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন, মুসলিম সিনেটর, জুকাকু পরিবার
ড: আব্দুল এল-সাঈদ ও ডা: সারাহ জুকাকু। সংগৃহীত

’সবকিছুর জন্য শুকরিয়া, অনেক ধন্যবাদ। তোমাকে ছাড়া এটি অর্জন করা সম্ভব হতো না এবং অন্য কাউকে পাশে নিয়ে আমি এটি করতেও চাইতাম না।’ বুধবার (৪ নভেম্বর) উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে স্ত্রী সারাহ জুকাকুকে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলছিলেন আবদুল আল-সাইয়িদ।

Advertisement

ওই দিন বিভিন্ন জরিপ ও গণমাধ্যমের পূর্বাভাসে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি মিশিগান থেকে জয়ী হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে যাচ্ছেন।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে পড়াশোনা করার সময় সারাহর সাথে আল-সাইয়িদে পরিচয় হয়। ২০ বছর ধরে তারা দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন এবং তাদের এমালি ও সেরিন নামে দুই মেয়ে রয়েছে।

Advertisement

আল-সাইয়িদ মিশরীয় বংশোদ্ভূত হলেও তার এই ঐতিহাসিক বিজয় ভারতের কর্ণাটক অঙ্গরাজ্যের উত্তর কন্নড় জেলার ভাটকল শহরের মানুষের জন্যও এক পরম আনন্দের কারণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সারাহ একজন মনোরোগ ও সাধারণ চিকিৎসক; তার পরিবার মূলত এই অঞ্চলেরই অধিবাসী।

সারাহর খালা আলিয়া নাজনীন জুকাকু, যিনি পেশায় একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ‘দ্য ওয়ার’-কে বলেন, ’আমরা এই বিজয়ে খুবই আনন্দিত, আলহামদুলিল্লাহ। নিশ্চিতভাবেই এটি উদযাপন করার মতো একটি বিষয়, তাই না?’ অনেক বছর বেঙ্গালুরু এবং সৌদি আরবে থাকার পর নাজনীন এখন ভাটকলে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

পরিবারের বিভিন্ন বিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আল-সাইয়িদ কিভাবে ভারতে এসেছিলেন, সে কথা তিনি সানন্দে স্মরণ করেন : ‘পারিবারিক দু-একটি বিয়েতে অংশ নিতে ও (আল-সাইয়িদ) ভাটকলে এসেছিল। তবে গত কয়েক বছর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের আর আসা হয়নি।’

সারাহর নানা জুকাকু শামসুদ্দিন ছিলেন খ্যাতনামা আইনজীবী। তিনি বি. ডি. জত্তির মন্ত্রিসভায় অর্থ উপমন্ত্রী এবং এস. নিজলিঙ্গাপ্পার মন্ত্রিসভায় বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৭ মার্চ ৫১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

শামসুদ্দিনের ছয় মেয়ে ও চার ছেলে ছিল। তার তৃতীয় ছেলে তৈয়ব জুকাকু হলেন সারাহর বাবা। তিনি বেঙ্গালুরু মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং একজন নেফ্রোলজিস্ট হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তৈয়ব ‘দ্য ওয়ার’-কে বলেন, ’এটি এমন একটি আন্দোলন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং আশা করি বিশ্বজুড়ে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার সক্ষমতা রাখে। এই জয় রাজনীতিকে করপোরেট লোভ ও ক্ষমতালিপ্সু দুর্নীতিগ্রস্ত এলিটদের হাত থেকে মুক্ত করার আশা জাগায়; সেই সাথে শান্তির জন্য না লড়ে যারা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বাঁধায়, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করায়।’

তিনি আরো বলেন, ’আবদুল [আল-সাইয়িদ] এবং তার পরিবারের ওপর প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত আক্রমণগুলো উল্টা তাদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের সব অস্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে।’

‘আশা করি আবদুল আমাদের বাবার মতো মানুষের সেবা করবে’
কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে চেন্নাইয়ে বসে তৈয়বের বড় ভাই আবদুস সালাম শামসুদ্দিন জুকাকুও গভীর আগ্রহ নিয়ে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

আবদুস সালাম ‘দ্য ওয়ার’-কে বলেন, ’নির্বাচনে পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে তা জানার জন্য আমি সারাক্ষণ নজর রাখছিলাম। অবশ্যই আমরা সবসময় তার এই জয়ের আশা করেছিলাম। তবে মাঝখানে ভোটের ব্যবধান বেশ কমে গিয়েছিল। যা-ই হোক, এখন এটি সবার জন্যই এক দুর্দান্ত মুহূর্ত, দারুণ এক ফলাফল ও বিরাট বড় জয়। আমার বাবাও রাজনীতিতে ছিলেন। আজও মানুষ কখনো কখনো কেঁদে ফেলে আমাকে বলে যে তোমার বাবা আমার জন্য এই কাজ করে দিয়েছিলেন, ওই উপকার করেছিলেন। আমি আশা করি, আবদুলও ঠিক একইভাবে কাজ করবে। আমাদের বাবার মতো সে-ও যেন সাধারণ মানুষের সেবা করে। অবশ্যই আমরা আবদুলকে নিয়ে গর্বিত, তবে সেই সাথে আমাদের বাবাকে নিয়েও আমরা ভীষণ গর্ব করি।’

আবদুস সালাম জোর দিয়ে বলেন, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

এল-সাইয়িদ শতকরা ৫২ ভাগের বেশি ভোট পাওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থানরত সারাহর সবচেয়ে ছোট মামা ফজলুর রহমান জুকাকু বলেন, এই বিজয় বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য এক আশার বার্তা নিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, ’আলহামদুলিল্লাহ, স্পষ্ট ব্যবধানে এটি এক বিশাল জয়, যাতে রিপাবলিকানরা কোনোরকম চক্রান্ত করে এই বিজয় নস্যাৎ করার সুযোগ না পায়।’

‘আমাদের দেশ যে একজন মুসলিমের দিকে তাকিয়ে তাকে ভিন্ন বা পর ভাবার মানসিকতা পেছনে ফেলতে পেরেছে, এতে আমরা আনন্দিত’
এল-সাইয়িদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ-পূর্ব মিশিগানে। তার বাবা মোহাম্মদ ছিলেন মিশরীয় অভিবাসী এবং তার সৎ মা জ্যাকি মিশিগানের স্থানীয় অধিবাসী।

২০১৮ সালে তিনি মিশিগানের গভর্নর পদের জন্য লড়াই করেছিলেন, তবে ডেমোক্র্যাট প্রাথমিকে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন।

একজন স্বনামধন্য রোডস স্কলার হিসেবে আল-সাইয়িদ ২০১১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন।

২০১৫ সালে তিনি ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে তিনি ওয়েন কাউন্টি স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন, যার আওতাভুক্ত ছিল ডেট্রয়েট শহরও।

আল-সাইয়িদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয় ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং ওয়াশিংটনে করপোরেট প্রভাব কমানো। তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ’তিনি মার্কিন সিনেটের জন্য লড়ছেন কারণ তিনি বিশ্বাস করেন আমেরিকায় জীবনধারণ এতটা কঠিন হওয়া উচিত নয়। আপনার সিনেটর হিসেবে আবদুল এমন একটি সরকার গঠনে লড়াই করবেন যা ইলন মাস্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাদের বিলিয়নিয়ার বন্ধুদের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবে।’

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তগুলোতে ডেট্রয়েটে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্ত্রী সারাহ বলেন, ’আবদুল বাইরে ঠিক যেমন, ভেতরেও তেমন। আমার ও আমার মেয়েদের কাছে আবদুল ঠিক যেমন, আপনাদের কাছেও সে হুবহু একই মানুষ। সে কোথায় আছে বা কার সাথে কথা বলছে তা নিয়ে কখনো কথা বদলায় না, কারণ সে মনেপ্রাণে এসব বিশ্বাস করে। আর এটাই তাকে সাধারণ রাজনীতিবিদদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। কোনো করপোরেশন, কোনো বিলিয়নিয়ার বা কোনো কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী তাকে কী বলতে হবে বা কী করতে হবে তা বলে দিতে পারে না—একমাত্র কখনো কখনো আমি ছাড়া!’

তবে সিনেট প্রচারণাকালে রিপাবলিকানরা ক্রমাগত আল-সাইয়িদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন ও ইসরাইলকে ওয়াশিংটনের সমর্থনের বিরুদ্ধে তার অবস্থানের জন্য তীব্র সমালোচনা করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আল-সাইয়িদকে ’মুসলিম চরমপন্থী’, ’আমাদের দেশকে ঘৃণা করা জিহাদি উন্মাদ’, ’মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য’ এবং ’সন্ত্রাসীদের সহানুভূতিশীল’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে স্ত্রী মে মেলানিয়ার সাথে নিজের একটি ছবির পাশে হিজাব পরিহিত সারাহ ও আল-সাইয়িদের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন : ‘দুটি পুরোপুরি ভিন্ন আমেরিকা’।

একইভাবে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাকে ’মনোরোগী’ ও ’প্রতারক’ বলে গালি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

গত বুধবার ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনী সদর দফতরে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেয়া বিজয়ী ভাষণে ৪২ বছর বয়সী নবনির্বাচিত সেনেটর ট্রাম্প ও ভ্যান্সকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেন। মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে জয় নিশ্চিত হওয়ার কিছু পরেই আল-সাইয়িদ বলেন, ’জেডি, হাবিবি [আরবি ভালোবাসার ডাক], বিধাতা কী দারুণ পরিহাস তৈরি করেছেন যে আগামী জানুয়ারিতে সংবিধানে বাধ্য হয়ে তোমাকেই আমাকে সিনেটর হিসেবে শপথ পাঠ করাতে হবে!’

মুহুর্মুহু করতালি ও আনন্দের মাঝে তিনি আরো যোগ করেন, ‘ডোনাল্ড, আমি জানি আমার নাম উচ্চারণ করতে তোমার কষ্ট হয়, তাই জেডি যখন আমাকে শপথ পাঠ করাবে, তখন তুমি আমাকে ‘সিনেটর’ বলে ডাকতে পারো। মিশিগানে তোমার মতো মানুষকে যেন আমাদের আর কখনো দেখতে না হয়। যেসব মা-বাবা তাদের সন্তানদের বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন যে কেন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে কারো নাম বা তাদের প্রার্থনার ধরন নিয়ে উপহাস করেন—তাদের বলবো, আগামী কাল সকালে সন্তানদের গিয়ে বলুন যে খলনায়করা হেরে গেছে!’

ভারতে জন্মগ্রহণকারী এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আল-সাইয়িদের শ্বশুর তৈয়বও জোর দিয়ে বলেন, ‘এই বিজয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মিশিগানের ভোটাররা ’তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে তৈরি করা পর বা ভিনদেশি ভাবার কৃত্রিম দেয়াল ভাঙতে পেরেছেন।’

তৈয়ব বলেন, ’আমরা আনন্দিত যে আমাদের দেশ একজন মুসলিমের দিকে তাকিয়ে তার ব্যক্তিত্ব ঘিরে তৈরি করা ভিন্ন ভাবার সংস্কৃতি বা দেয়াল অতিক্রম করতে পেরেছে এবং তার মূল্যবোধ, সততা ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে তাকে বিজয়ী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এবং আশা করি পুরো দুনিয়ার জন্যই এটি একটি চমৎকার দিন।’