টিউশনি, সঞ্চয়পত্র ও লটারির আয়েও কর দিতে হবে শিক্ষককে

বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

চাকরির পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিউশনি, লটারি এবং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ- একজন করদাতার আয়কর হিসাবের ক্ষেত্রে আয়ের এসব পৃথক উৎস কিভাবে বিবেচিত হবে, তার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে ২০২৬-২৭ করবর্ষের আয়কর নির্দেশিকায়। এতে একজন বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌফিকুর রহমানের বার্ষিক আয়, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত, সম্পদের ওপর সারচার্জ এবং উৎসে কর্তিত কর সমন্বয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।
নির্দেশিকার উদাহরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তৌফিকুর রহমানের চাকরি থেকে মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় সাত লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মাসিক মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা হিসাবে বছরে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া ভাতা এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা ২৪ হাজার টাকা, দু’টি উৎসব বোনাস বাবদ ৮০ হাজার টাকা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা ১০ হাজার টাকা রয়েছে।
তবে চাকরি থেকে প্রাপ্ত পুরো অর্থ করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। নির্দেশিকার হিসাব অনুযায়ী, মোট প্রাপ্তির এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা অথবা পাঁচ লাখ টাকা- এ দু’টির মধ্যে যেটি কম, সেটি বাদ দিয়ে চাকরি থেকে করযোগ্য আয় নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এর পাশাপাশি তৌফিকুর রহমান নিজ বাসায় চারটি ব্যাচে শিক্ষার্থী পড়ান। প্রতিটি ব্যাচে আটজন করে শিক্ষার্থী এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসিক চার হাজার টাকা করে সম্মানী নেন তিনি। এ হিসাবে টিউশনি থেকে তার বার্ষিক আয় দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। চাকরির আয় ও টিউশনির আয় মিলিয়ে তার মোট আয় হয় ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
কর নির্ধারণ ও বিনিয়োগজনিত রেয়াত
নির্দেশিকায় প্রদর্শিত ২০২৬-২৭ করবর্ষের করহার অনুযায়ী,  প্রথম চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর শূন্য। পরবর্তী তিন লাখ টাকায় ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা, পরবর্তী চার লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ হারে ৬০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ হারে এক লাখ টাকা কর নির্ধারিত হয়েছে। অবশিষ্ট চার লাখ ৫৬ হাজার টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে এক লাখ ১৪ হাজার টাকা কর দিতে হবে। সব মিলিয়ে রেয়াতের আগে তার আয়কর দাঁড়ায় তিন লাখ চার হাজার টাকা।
অন্য দিকে, ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে তিনি চার লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। এ বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের হিসাব করা হয়েছে। নির্দেশিকায় দেখানো তিনটি সীমার মধ্যে সর্বনিম্নœ অর্থাৎ ৪০ হাজার টাকা রেয়াত হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। ফলে কর রেয়াত বাদ দেয়ার পর তার আয়কর দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
নিট সম্পদের কারণে সারচার্জ
তৌফিকুর রহমানের ২০২৬ সালের ৩০ জুন তারিখে নিট সম্পদের পরিমাণ চার কোটি ৪০ লাখ টাকা। নির্দেশিকায় নির্ধারিত চার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করায় তার ওপর ১০ শতাংশ সারচার্জ আরোপের হিসাব দেখানো হয়েছে।
এ হিসাবে তিন লাখ চার হাজার টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। আয়কর ও সারচার্জ মিলিয়ে তার মোট করের দায় হয় দুই লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টাকা।
তবে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই লটারিতে পাওয়া ১০ লাখ টাকা ২০২৬-২৭ আয়বর্ষের আয় হলেও তা ২০২৭-২৮ করবর্ষের আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করতে হবে। লটারির অর্থের বিপরীতে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা উৎসে কর কাটা হয়েছে। অর্থাৎ আয় অর্জনের সময় এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষে তা প্রদর্শনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, উপস্থাপিত হিসাবটি আয়কর নির্দেশিকার উদাহরণ অনুসারে তৈরি। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাকরি ও টিউশনির আয়, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত, সারচার্জ এবং উৎসে কর্তিত করের সমন্বয় পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হয়। বাস্তবে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের আইন, করমুক্ত সীমা ও উৎসে করের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
শিল্পীর আয়কর 
গান পরিবেশনের মাধ্যমে আয় করা পেশাদার শিল্পীদেরও আয়কর দিতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত মোট আয় থেকে পেশাগত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় নির্ধারণ করা যায়। ২০২৬-২৭ করবর্ষের আয়কর নির্দেশিকায় মিজ সঞ্চারী চক্রবর্তী নামের একজন কণ্ঠশিল্পীর আয় ও কর নির্ধারণের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
নির্দেশিকার তথ্য অনুযায়ী, সঞ্চারী চক্রবর্তী একজন কণ্ঠশিল্পী। ময়মনসিংহ অঞ্চলে তার নিজস্ব একটি গানের দল রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে দল নিয়ে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি আয় করেন। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে সঙ্গীত পরিবেশন করে তার মোট আয় হয়েছে ১৮ লাখ টাকা।
তার গানের দলে তিনজন সহশিল্পী, তিনজন যন্ত্রশিল্পী এবং দু’জন তবলাবাদক রয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
নির্দেশিকার হিসাব অনুযায়ী, তিনজন সহশিল্পীকে মাসে ১২ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হয়েছে। এ খাতে বার্ষিক ব্যয় চার লাখ ৩২ হাজার টাকা। তিনজন যন্ত্রশিল্পীকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেয়ায় বছরে ব্যয় হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্য দিকে, দুইজন তবলাবাদককে মাসে আট হাজার টাকা করে দেয়ায় তাদের পেছনে বার্ষিক ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে গানের দলের আট সদস্যের বেতন বাবদ সঞ্চারী চক্রবর্তীর বার্ষিক ব্যয় হয়েছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
এ ছাড়া শিল্পীদের পোশাক কেনা ও যাতায়াত বাবদ যথাক্রমে ১৫ হাজার ও ৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এ দুই খাতে মোট ব্যয় ২৪ হাজার টাকা।
ফলে সঙ্গীত পরিবেশন থেকে পাওয়া ১৮ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে মোট পেশাগত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ আট হাজার টাকা। এসব ব্যয় বাদ দেয়ার পর তার নিট আয় হয়েছে সাত লাখ ৯২ হাজার টাকা।
আয়কর নির্ধারণ
২০২৬-২৭ করবর্ষের নির্দেশিকায় প্রদর্শিত করহার অনুযায়ী, প্রথম চার লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ে কর শূন্য। পরবর্তী তিন লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪২ হাজার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩০০ টাকা।
এ হিসাবে সঞ্চারী চক্রবর্তীর মোট প্রদেয় আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৩০০ টাকা।
বিশ্লেষণ : আয়কর নির্দেশিকার এ উদাহরণে সঙ্গীতশিল্পীদের পেশাগত আয় নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। কোনো শিল্পী ব্যক্তিগতভাবে গান পরিবেশন করলেও তার সাথে সহশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী ও অন্যান্য সহযোগী যুক্ত থাকলে তাদের পারিশ্রমিক পেশাগত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে পোশাক ও যাতায়াতের মতো কাজ-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও যথাযথ প্রমাণপত্রের ভিত্তিতে বাদ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ব্যয় গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে সরাসরি সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ থাকা জরুরি।  

 

Advertisement