
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো বুধবার (২৮ অক্টোবর) নিজেকে দেশের প্রকৃত নেতা দাবি করেছেন। গত রোববারের নাটকীয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে বামপন্থী লুইজ ইনাসিও লুলার কাছে হেরে গিয়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি এ দাবি করেন।
ফ্লোরিডায় পৌঁছেই ফ্লাভিওর এমন অনড় অবস্থান ব্রাজিলের রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটিতে রোববারের নাটকীয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা জয়ী হন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে ‘নির্বাচনী জালিয়াতির’ অভিযোগ তুলে বলসোনারো বলেন, ‘আমিই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। আর যারা ব্রাজিলের নির্বাচন চুরি করেছে, তারা একটি অপরাধী চক্রের অংশ, যারা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি এখান থেকেই বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দেবো।’
পরবর্তী এক বিবৃতিতে অবশ্য তিনি নিজের দাবিতে পরিবর্তন এনে ‘প্রেসিডেন্ট’-এর পরিবর্তে নিজেকে ‘নেতা’ বলে উল্লেখ করেন।
৪৫ বছর বয়সী বলসোনারো এর আগে বুধবার একটি বেসরকারি উড়োজাহাজে মিয়ামির কাছে ওপা-লকায় নির্বাহী বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের ব্রাজিলের সিনেটে বলসোনারোর লিবারেল পার্টির নেতা রোজেরিও মারিনহো বলেন, সাবেক এই প্রার্থীর প্রতি তিনি ‘সংহতি’ প্রকাশ করছেন। তিনি বলসোনারোকে ‘রাজনৈতিক নির্বাসিত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে তিনি বলসোনারোর বিবৃতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, ‘লিবারেল পার্টি এমন দাবি করতে পারে না। এর কোনো প্রমাণ নেই।’
সাংবাদিকদের মারিনহো বলেন, ‘ফ্লাভিও বলসোনারো বর্তমানে ব্রাজিলের ডানপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ... তিনি নিজেকে নেতা বলছেন এবং এটি সত্য যে তিনি একজন নেতা।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর ডানপন্থী প্রশাসনের সাথে বলসোনারো ও তার বাবা জাইর বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২২ সালে লুলার কাছে নিজের নির্বাচনী পরাজয় উল্টে দেয়ার চেষ্টা করার পর জাইর বলসোনারো ব্রাজিলে গৃহবন্দী রয়েছেন।
ট্রাম্প আবারো ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘খুবই অদ্ভুত’ বলে মন্তব্য করেন। তবে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রেসিডেন্ট পদের দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এতে জড়াব না।’
স্ত্রী ও মেয়েদের সাথে নিয়ে কিভাবে বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসছে।
নিজ দেশে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সংসদ সদস্য হিসেবে তার বর্তমান দায়মুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় তাকে পাসপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।
ব্রাজিলের পুলিশের একটি সূত্র বার্তাসংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, বলসোনারোর ব্রাজিলীয় ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে।
তবে এএফপির দেখা ইতালীয় নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এই সিনেটর ইতালির নাগরিকত্বও ধারণ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, বলসোনারো পরিবারের সদস্যদের অভিবাসন আইন ও প্রযোজ্য প্রক্রিয়া অনুসারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের প্রভাবশালী বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েস এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তিনি বলসোনারোর বাবার বিরুদ্ধে মামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ব্রাজিলের ডানপন্থীদের কাছে তিনি একজন বিতর্কিত ও ব্যাপকভাবে অপছন্দের ব্যক্তিত্ব।
‘লজ্জাজনক’ পদক্ষেপ
রোববারের নির্বাচনে ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী লুলা বলসোনারোর দেশত্যাগকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
মঙ্গলবার ব্রাসিলিয়ায় নিজের ৮১তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের দেশ থেকে গোপনে পালিয়ে যায়, তার নিশ্চয়ই লুকানোর মতো কিছু আছে।’
তবে ব্রাজিলের পুলিশ বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বলসোনারোকে পলাতক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
প্রতিবেশী আর্জেন্টিনায়ও এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। দেশটির বিরোধী আইনপ্রণেতারা জানতে চেয়েছেন, কিভাবে বলসোনারো আর্জেন্টিনার ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশে চলে গেলেন।
বিরোধী আইনপ্রণেতা আগুস্তিন রসির বরাতে জানা গেছে, আর্জেন্টিনার কর্তৃপক্ষ বলেছে, বলসোনারোর কাছে বৈধ ভ্রমণ নথি ছিল। তবে দেশটির কর্মকর্তারা কিভাবে তিনি আর্জেন্টিনা হয়ে গেছেন, সে বিষয়ে পার্লামেন্টে বিস্তারিত জানাতে চিফ অব কেবিনেট দিয়েগো সান্তিলির কাছে তথ্য চেয়েছেন।
জালিয়াতির মামলা
ব্রাজিলে বলসোনারোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত জালিয়াতির অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অপ্রকাশিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ডার্ক হর্স’। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা জিম ক্যাভিজেলকে ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারোর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে।
গত মে মাসে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট ব্রাজিল’ প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, চলচ্চিত্রটির অর্থায়নের জন্য ফ্লাভিও বলসোনারো ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভরকারোর সাথে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ ডলার নিয়ে আলোচনা করছেন। ব্রাজিলের অন্যতম বৃহৎ জালিয়াতির মামলায় ভরকারো বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
অডিও ফাঁস হওয়ার আগে ফ্লাভিও বলসোনারো ভরকারোকে চেনার কথা কিংবা তিনি চলচ্চিত্রটির অর্থায়ন করেছেন এমন দাবি অস্বীকার করেছিলেন।
জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্ট চলচ্চিত্রটির অর্থায়নে দুর্নীতি, অর্থ পাচার কিংবা অবৈধভাবে মুদ্রা স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দেন।
বলসোনারো স্বীকার করেছেন যে ভরকারো চলচ্চিত্রটিতে অর্থায়ন করেছেন। তবে তার দাবি, এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক চুক্তি, যা ‘সম্পূর্ণ বৈধ’।
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








