
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে পৌঁছেছেন কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। নির্বাচনে পরাজয়ের কয়েক দিনের মাথায় তাঁর আকস্মিক দেশত্যাগ ব্রাজিলের রক্ষণশীল রাজনীতিতে নতুন করে ক্ষমতার লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সাথে অর্থ পাচার ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে চলমান তদন্তে তাঁকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আল জাজিরা জানায়, রোববার রাতে ফ্লাভিওর সাধারণ ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দেন ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস। তদন্তের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন বলে আশঙ্কা করেছিলেন বিচারপতি। সিনেটর ও তাঁর বন্ধু উইলারের তমাজকে ঘিরে অর্থ পাচার ও মুদ্রা পাচারের তদন্ত চলছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, তমাজ দুই সপ্তাহ আগেই ব্রাজিল ছেড়ে চম্পট দিয়েছেন। তিনি মায়ামিতে চলে গেছেন।
আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে স্থলপথে ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আর্জেন্টিনায় ঢোকেন। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তাঁরা বায়রেস ফ্লাই পরিচালিত একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশে রওনা হন। সেখান থেকে উড়োজাহাজটি মায়ামির পথে যাত্রা করে। বুধবার সকালে মায়ামির কাছে ওপা-লকায় নির্বাহী বিমানবন্দরে পৌঁছান তাঁরা। এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করে, ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেয়া হবে।
ব্রাজিলের নির্বাচনে রোববারের ফল এখনো স্বীকার করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ওই নির্বাচনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন মধ্য-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। ভোটের ব্যবধান ছিল ৪৪ লাখের বেশি।
সোমবার ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ব্রাজিলের নির্বাচন ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মনে হচ্ছে। তবে একই সাথে তিনি লুলার প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথাও জানান।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাজিলের অনেক ভোটার। সাও পাওলোর ৩৬ বছর বয়সী ক্রিস্তিয়ানা কুনহা আল জাজিরাকে বলেন, ‘নিজের কাজের পরিণতির মুখোমুখি হতে না চাওয়া একজন কাপুরুষের মতো আচরণ করছেন তিনি।’ ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার খবরে অবশ্য তিনি বিস্মিত হননি।
সাও পাওলোর ৪৫ বছর বয়সী মনোবিশ্লেষক প্রিসিলা কারদোসো আরো কঠোর ভাষায় বলেন, ‘এটা একটা প্রহসন। নর্দমা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া পরজীবীর মতো।’
ডেমোক্রেসি ইন চেক ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাওলো রবার্তো দে সুজার মতে, ফ্লাভিওর দেশত্যাগ ব্রাজিলের ডানপন্থীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষমতার লড়াইয়ের পথ খুলে দিতে পারে। এতে বলসোনারো পরিবার একসময় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘দেশ ছেড়ে গিয়ে ফ্লাভিও ডানপন্থীদের জন্য বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক সম্পদের ভাগ নিয়ে লড়াই করা সহজ করে দিয়েছেন।’ ভোটের ব্যবধান তুলনামূলক কম হলেও রোববারের পরাজয়কে তিনি পরিবারটির জন্য ‘অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করেন।
দে সুজা বলেন, ২০২২ সালে ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারো ব্রাজিলের প্রথম ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচনে হেরেছিলেন। আর ২০২৬ সালে ফ্লাভিও প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হওয়া প্রথম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এতে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা সীমা স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
নির্বাচনের পর ফ্লাভিও সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ভোটের ফল মেনে নেয়া তাঁর পক্ষে ‘অসম্ভব’। নির্বাচন বাতিলের আবেদন করার কথাও জানান তিনি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তি ছিল রোববার ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের শেষ মুহূর্তের একটি সিদ্ধান্ত। দুই প্রার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের অপ্রতুলতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছিল।
তবে সরকারি হিসাব বলছে, বাড়তি দুই ঘণ্টায় ৩৫ হাজারেরও কম ভোট পড়েছে। অন্যদিকে লুলার জয়ের ব্যবধান ছিল ৪৪ লাখের বেশি ভোট।
নির্বাচন বাতিলের দাবি অনেক ভোটারের কাছে পরাজয় মেনে নিতে না পারার প্রকাশ বলে মনে হয়েছে। সিঙ্গেল মাদার কারদোসো বলেন, ‘খেলায় হেরে বল নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়া এক বখাটে বাচ্চার মতো আচরণ করছেন তিনি।’
ফ্লাভিও হার স্বীকার না করলেও তাঁর দল লিবারেল পার্টি নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছে। তাঁর কয়েকজন প্রভাবশালী মিত্রও নির্বাচনের অধ্যায় পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চাইছেন।
সাও পাওলোর গভর্নর তারসিসিও দে ফ্রেইতাস তাঁদের অন্যতম। ফ্লাভিওর সঙ্গে প্রচারে অংশ নেয়া এই নেতা প্রথম দফার ভোটেই বিপুল ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দুই মিনিটের ভিডিওতে তিনি দেশের জন্য নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সেখানে ফ্লাভিওর কথা উল্লেখ করেন মাত্র একবার।
দে সুজা বলেন, ‘ব্রাজিলের ডানপন্থীদের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নিঃসন্দেহে তারসিসিওই প্রধান ব্যক্তি।’ তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে চলার পাশাপাশি কট্টর বলসোনারোপন্থীদের কাছে নিজেকে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে তুলে ধরাও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
দে সুজার ধারণা, ২০৩০ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বলসোনারো পরিবারের কোনো সদস্যের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁদের ভূমিকা বরং অন্য প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।
তবে ভোটারদের মধ্যে পরিবারটির রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ধারণা এখনো তেমন জোরালো নয়। ক্রিস্তিয়ানা কুনহা বলেন, ‘বলসোনারো পরিবার সব সময়ই ব্রাজিলে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।’ তিনি ফ্লাভিওর ভাই কার্লোস ও শাশুড়ি মিশেলের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
কুনহার ধারণা, ২০৩০ সালের নির্বাচনে বলসোনারো পরিবারের কেউ না কেউ প্রার্থী হতে পারেন। তবে কে সেই প্রার্থী হবেন, তা তিনি জানেন না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








