মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংগৃহীত ছবি

এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নাম আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ঘোষণা করা হবে। তবে এবার পুরস্কার ঘোষণার চেয়েও বেশি আলোচনায় রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। নিজেই এ পুরস্কার পেতে আগ্রহী ট্রাম্প বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর কী প্রতিক্রিয়া জানান, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

Advertisement

নরওয়ের রাজধানী অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউটে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় (গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা) পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও সঙ্কটের মধ্যে এ বছর মর্যাদাপূর্ণ এই কূটনৈতিক ও মানবিক স্বীকৃতির জন্য ২৮৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

তবে মনোনীতদের নাম ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। ফলে কে এই পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে নোবেল পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা জল্পনা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি বিষয়ে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে— এ বছর ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, আটটি পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন এবং নিজেকে এ পুরস্কারের সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার বলে মনে করেন। তবে তার এসব দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

বুধবার ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের এমন সুনাম রয়েছে যে, তারা হয়তো আমার মতো মানুষকে এ পুরস্কার দেবে না। আমার মনে হয়, এটি তাদের জন্য বড় ধরনের অসম্মানের বিষয় হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি অবশ্য অবজ্ঞা করে এ কথা বলছি না।’

অন্যদিকে, অসলোতে ট্রাম্পকে এ পুরস্কারের অনুপযুক্ত বলে মনে করার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ডের মতো ভূখণ্ড সম্প্রসারণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও সংবাদমাধ্যমের ওপর তার আক্রমণাত্মক মনোভাব।

নরওয়ের নোবেল কমিটি যাকেই বিজয়ী হিসেবে বেছে নিক না কেন, সেই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্পের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআইও) প্রধান হাকন গ্যেরলো বলেন, হোয়াইট হাউস থেকে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে নোবেল কমিটিকে ভাবতে হবে, এ পুরস্কার প্রাপককে উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে কি না।

গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তার এ পুরস্কার পাওয়া ট্রাম্পের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল।

এমনকি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ট্রাম্পই পুরস্কারটির বেশি যোগ্য বলে মনে করে মাচাদো তাকে নিজের নোবেল পদকটি দিয়েছিলেন। তবে এর বিনিময়ে তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারেননি।

বার্তাসংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯০১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার চালুর পর থেকে বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কমিটির বিবেচ্য বিষয়গুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে এ প্রবণতা আরো জোরালো হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিও ক্রমে গুরুত্ব পেতে থাকে।

তবে নোবেল কমিটির দাবি, বাইরের কোনো চাপ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না।

কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হারপভিকেন এএফপিকে বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এসব বিষয় বৈঠকের আলোচনা বা সেখান থেকে নেয়া সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।’

সর্বসম্মত পছন্দ, নাকি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুরক্ষা কিংবা মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দিলে তা নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হতে পারে। একইসাথে এমন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।

সম্ভাব্য প্রাপকদের মধ্যে রয়েছে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এবং ইউক্রেনের মিকোলা কুলেবা। রাশিয়ায় বেআইনিভাবে নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রচার চালিয়ে আসছেন কুলেবা। বিষয়টি ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়ার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

সুদানে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের দ্বিমুখী সঙ্কটে পড়া মানুষের সহায়তায় কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবীদের বিশাল নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ (ইআরআর)। বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেও জীবন বাজি রেখে কাজ করা এই সংগঠনটিও পুরস্কার পেতে পারে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) প্রধান করিম হাগাগ বলেন, এ বছরের পুরস্কারের জন্য তার পছন্দ ইআরআর।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সুদানের সংঘাতের কথা মানুষ ভুলে গেছে। অথচ এই সংঘাতে ভয়াবহ মানবিক দুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে।’

তবে নোবেল কমিটি এমন কাউকেও বেছে নিতে পারে, যার পুরস্কার পাওয়া ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করতে পারে।

সম্ভাব্য এমন প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানিজে, পোপ চতুর্দশ লিও, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)।

সোমবার শেষ হচ্ছে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মৌসুম
নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর আগামী সোমবার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের পুরস্কার ঘোষণার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

এর আগে চলতি সপ্তাহে সুইডেনের স্টকহোমে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি অ্যান কারসন। গ্রিক পুরাণ ও প্রাচীন ইতিহাসকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের সাথে দেয়া হয় একটি সনদ, একটি স্বর্ণপদক এবং ১২ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থমূল্য। আগামী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।

সূত্র : বাসস