
মালদ্বীপে চলমান বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের দেশে অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থা আরো সহজ, নিরাপদ ও বৈধ করার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজছে বাংলাদেশ হাইকমিশন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মালে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর পথ সুগম করতে মালদ্বীপে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো: নাজমুল ইসলাম সম্প্রতি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যরত ভারতীয় স্টেট ব্যাংক, শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন এবং পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সাথে পৃথক পৃথক বৈঠক করেন।
বৈঠকগুলোতে মালদ্বীপের বর্তমান ডলার সঙ্কট, ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি, প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ, মুদ্রা রূপান্তর ও অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা এবং সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে কার্যরত ব্যাংকগুলোর জন্য স্থানীয় মুদ্রা (রুফিয়া) থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর এবং বহির্মুখী অর্থপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এটি কেবল বাংলাদেশী কর্মীদের সমস্যা নয়, বরং মালদ্বীপের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক সোয়াপ ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে হাইকমিশন জানায়, বৈঠকে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের মাধ্যমে একসময় ভারতীয় প্রবাসীরা যেখানে মাসে ৭০০ ডলার পর্যন্ত পাঠাতে পারতেন, তা পর্যায়ক্রমে কমে বর্তমানে ১৫০ ডলারে নেমে এসেছে। আলোচনায় ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যকার মুদ্রা রূপান্তর ও কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা থেকেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন জানিয়েছে, মুদ্রা রূপান্তর জটিলতায় নতুন রেমিট্যান্স হিসাব খোলার ক্ষেত্রে তারা ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে। পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সীমা এক হাজার ডলার থেকে কমে বর্তমানে ৩০০ ডলারে নেমে এসেছে। তবে পাকিস্তানি প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম (৪০০ থেকে ৭০০ জন) হওয়ায় তাদের রেমিট্যান্স রূপান্তর কিছুটা সহজ হচ্ছে।
বাংলাদেশী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ একটু ভিন্ন উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকগুলো থেকে উঠে আসে যে, অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের একটি বড় অংশ দক্ষ ও পেশাজীবী হওয়ায় তারা মার্কিন ডলারে বেতন পান বা বৈদেশিক মুদ্রায় সরাসরি প্রবেশাধিকার রাখেন। কিন্তু মালদ্বীপে অবস্থানরত এক লাখের বেশি বাংলাদেশী প্রবাসীর সিংহভাগই অর্ধদক্ষ ও নিম্নদক্ষ কর্মী, যারা স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়ায় বেতন পান। ফলে তাদের উপার্জিত রুফিয়াকে ডলারে রূপান্তর করে দেশে পাঠানোর চাহিদা ও চাপ ব্যাংকগুলোর ওপর অনেক বেশি, যা বাংলাদেশী প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে এক বিশেষ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বাংলাদেশী প্রবাসীদের জন্য ৫০ থেকে ১০০ ডলার প্রেরণের সুযোগ খোঁজার আহ্বান জানিয়ে হাইকমিশন বলছে, এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে থেকে বাংলাদেশী প্রবাসীদের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট পরিমাণের— যেমন অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা মালদ্বীপে অবস্থিত ব্যাংকগুলোর কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আহ্বান জানান হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলাম।
হাইকমিশনার স্পষ্ট করে বলেন, এর উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দাবি করা নয়; বরং অনুমোদিত ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় স্বল্প পরিমাণের হলেও একটি নির্ভরযোগ্য রেমিট্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
রুফিয়ায় বেতন পাওয়া একজন শ্রমিকের ৫০ বা ১০০ ডলারও তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, বৈঠকে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক লেনদেন জোরদারের ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোকপাত করা হয়।
প্রবাসীদের সহায়তায় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশীরা কঠোর পরিশ্রম করে দেশে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠান। তাদের বাস্তব সমস্যা বুঝে বিদ্যমান ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্ভাব্য প্রতিটি টেকসই পথ অনুসন্ধান করা আমাদের দায়িত্ব। মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রবাসীদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও বৈধ রেমিট্যান্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হাইকমিশনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’ বাসস







