ইমরান খান, ভারত, ভারতের মুসলিম
বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। সংগৃহীত

ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ দেয়ায় দেশটির অভিনেতা ইমরান খানকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করল মুম্বাই হাইকোর্ট। 

Advertisement

সোমবার (২ নভেম্বর) আদালত তার উদ্দেশে জানিয়েছে, তিনি আমেরিকার নাগরিক এবং ‘ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া’ (ওসিআই) কার্ডধারী। তাই ভারতীয় নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক অধিকার এ দেশে (ভারত) তার নেই। 

একইসাথে আদালত প্রশ্ন তোলে, কোনো ভারতীয় নাগরিক যদি আমেরিকায় গিয়ে একই ধরনের প্রতিবাদে অংশ নেন, তাহলে তার সাথে কী ধরনের আচরণ করা হত!?

আমির খানের ভাগ্নের উদ্দেশে বিচারপতিদের বেঞ্চ বলে, ‘আপনি একজন ওসিআই কার্ডধারী। আপনি ভারতীয় নাগরিকের মতো আচরণ (অধিকার সংক্রান্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া) করতে পারেন না। এসআইআর নিয়ে আপনার কিছু বলার নেই। প্রতিবাদে যোগ দেয়ার কোনো অধিকার আপনার ছিল না। আদালতের কাছে আপনাকে স্পষ্টভাবে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

আরো পড়ুন—দলে নেই রোনালদো, সৌদি নিরাপত্তা উদ্বেগে এশিয়ান কাপ আয়োজন নিয়ে শঙ্কা

ইমরানের হয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী বেঙ্কটেশ ধোন্ড জানান, ৪২ বছর বয়সী অভিনেতা জীবনের প্রায় পুরোটাই ভারতে কাটিয়েছেন। জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিকত্ব পেলেও তার বেড়ে ওঠা এই দেশেই। তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তা সত্ত্বেও তিনি ভারতীয় নাগরিক নন।

ইমরানকে উদ্দেশ করে বিচারপতিরা বলেছেন, ‘আপনি ভারতীয় নাগরিক নন। ধরুন, কোনো ভারতীয় নাগরিক অন্য কোনো দেশে, ধরুন আপনার দেশ আমেরিকায় গিয়ে এমন প্রতিবাদে যোগ দিলেন। তাহলে তাকে তো পরবর্তী বিমানে করে দেশে ফেরত পাঠানো হত।’

ভারতে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটানো এবং বলিউডে পরিচিতি তৈরি করার পরেও ইমরান কেন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি, সেই প্রশ্নও তোলে আদালত। বিচারপতিরা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আপনি এখানে রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করছেন না কেন? বলিউডেই তো আপনি তারকা হয়েছেন।’

অন্য এক পর্যবেক্ষণে আদালত জানায়, কয়েক দশক ভারতে থাকার ফলে ইমরান সম্ভবত নিজের ওসিআই কার্ডধারী পরিচয়ের কথাই ভুলে গিয়েছেন। বিচারপতিরা বলেন, ‘সম্ভবত এখানে অনেক দিন ধরে রয়েছেন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন, তাই হয়তো মনে নেই যে আপনি একজন ওসিআই কার্ডধারী।’

ইমরানের দায়ের করা একটি মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করে আদালত। ‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’ তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে যে ‘লিভ ইন্ডিয়া নোটিস’ জারি করেছিল, তাকে চ্যালেঞ্জ করেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিনেতা। গত সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি এমসি ত্রিপাঠী এবং বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনার বেঞ্চ ওই নোটিসের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।

ইমরানের হয়ে প্রশ্ন করে ধোন্ড জানান, অভিনেতার জন্ম আমেরিকায় এবং সেই সূত্রেই তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তবে তার গোটা জীবন কেটেছে ভারতে। আইনজীবী আরো জানান, ২০০৬ সালে ওসিআই মর্যাদা পাওয়ার আগে ইমরানের কাছে ‘পার্সন অফ ইন্ডিয়ান অরিজিন’ কার্ড ছিল। আইনজীবী আরো জানান, ইমরান ভারতে বিয়ে করেছেন এবং বলিউডে কাজ করেছেন। যদিও বর্তমানে তার হাতে কোনো ছবির কাজ নেই।

অভিনেতার দাবি, প্রতিবাদে যোগ দেয়া কোনো সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলেও আদালতকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হন তিনি।

তবে ‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’র হয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিংহ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তার দাবি, প্রতিবাদে ইমরানের যুক্ত থাকার প্রমাণ রয়েছে। অভিনেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পোস্ট এবং একটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারটি ইমরানের তরফ থেকে আদালতে জমা দেয়া হয়নি বলেও জানান অনিল। তার যুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরানের বিপুল অনুরাগী থাকায় তার বক্তব্য বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

অনিল আরো অভিযোগ করেন, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অতীতেও ইমরান একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো বিদেশী নাগরিক ক্ষমা চাইলেই অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় না।

অন্য দিকে, তারকা হিসেবে ইমরানের বক্তব্যের প্রভাব কতটা হতে পারে, তা-ও মনে করিয়ে দেয় আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, ‘আপনি একজন তারকা। আপনার কথার প্রভাব রয়েছে। এই দেশের উদারতা দেখুন। আপনি একজন ওসিআই কার্ডধারী, অথচ আপনার সমস্ত পরিচিতি ভারত, মহারাষ্ট্র থেকেই এসেছে।’ 

ধোন্ড জানান, ইমরান প্রতিবাদে যোগ দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে মক্কেলের সাথে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

আদালত ফের জানায়, ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারেন না। বিদেশী নাগরিকদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করে বেঞ্চ।

‘ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস’র অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলের উদ্দেশে বিচারপতিরা বলেন, ‘আপনারা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। বহিষ্কার করার সম্পূর্ণ অধিকার আপনাদের রয়েছে। আপনাদের সেই ক্ষমতা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু এখানে কী ঘটেছিল, সেটাই বিবেচ্য। মুম্বাই পুলিশ যদি বলে, আদৌ কিছু ঘটেনি, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে।’ তবে অনিল সিংহের বক্তব্য, আদালত যে ধরনের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ চাইছে, তা না থাকলেও সরকারের পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার রয়েছে। তার দাবি, ইমরানের আরো দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল।

বিদেশী নাগরিকদের প্রতি ভারতের মনোভাব নিয়ে আলোচনার সময় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’— অর্থাৎ গোটা বিশ্বই এক পরিবার— নীতির কথাও উল্লেখ করে আদালত। পরে বেঞ্চ জানায়, ইমরান লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘এই দেশের উদারতা রয়েছে। আপনাকেও বড় মনের পরিচয় দিতে হবে।’

তবে ক্ষমা চাওয়া এবং লিখিত প্রতিশ্রুতিকে ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার অনুমতি হিসেবে দেখা যাবে না বলেও স্পষ্ট করে দেয় আদালত। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘তারা সরকারের দয়ায় এখানে রয়েছেন। এখানে থেকে সরকারের সমালোচনা করতে পারেন না। এটা মেনে নেয়া যায় না। ক্ষমা চাওয়াকে সবুজ সঙ্কেত হিসেবে দেখা যাবে না।’

ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারেন না—এই অবস্থানও ফের জানিয়ে দেয় হাইকোর্ট। আপাতত ইমরানের বিরুদ্ধে জারি হওয়া ‘লিভ ইন্ডিয়া নোটিস’র ওপর স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে আদালত। আগামী ৭ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি। সূত্র : ইমরান খান