
ভারত স্বাধীনতার ইতিহাসে মুসলমানদের ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির আলোচিত মুখ ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসার) সভাপতি নেহা বোরা। তিনি বলেছেন, অথচ আজ সেই মুসলমানদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাদের ‘পাকিস্তানি’ আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদের পাঠ শেখানো হয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে একথা বলতে শোনা যায়। ওই ভিডিওতে নেহা বোরা আরো বলেন, তারা বারবার বলে, এই হিন্দুস্তানে মুসলমানদের কোনো জায়গা নেই। তাহলে আরএসএসের জেনে রাখা উচিত যে, যখন স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা (তিরঙ্গা) প্রথমবারের মতো দিল্লিতে এক মুসলিম দম্পতির হাতে তৈরি হচ্ছিলো, তখন এই আরএসএসের লোকেরাই তাদের পত্রপত্রিকায় লিখেছিল, ভারতের হিন্দুরা কখনোই এই তিরঙ্গা (তিন রঙ বিশিষ্ট) পতাকা মেনে নেবে না।
নেহার দাবি- হিন্দু সংস্কৃতিতে ‘তিন’ সংখ্যাকে অত্যন্ত অশুভ মনে করা হয়। তার সূত্র ধরে তিনি বলেন, তাই তারা বলে- ‘এই তিরঙ্গা কখনো আমাদের পতাকা হতে পারে না, এই স্বাধীনতা কখনো আমাদের স্বাধীনতা হতে পারে না।’
নেহা বোরা বলেন, আজ যারা জাতীয়তাবাদ, ‘বন্দে মাতরম’ কিংবা অন্যান্য নানা অজুহাতে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করে, তাদের মনে রাখা উচিত- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস আজও সেই মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত।
তিনি বলেন, আজ যারা গোরক্ষার নামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলিতদের হত্যা করে, তাদের মধ্যে আরএসএসের লোকদের যদি কারো মূর্তি ভাঙতে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, সেটি হলো আম্বেদকরের মূর্তি। তার মূর্তিতে কালি মাখিয়ে দেয়াও তাদের পছন্দের কাজ। অথচ এই আম্বেদকরই স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনা করেছেন। দেশের বিচারব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নেহা বলেন, যারা স্বাধীনতার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঝলকারি বাইয়ের মতো বিপ্লবীদের ঐতিহাসিক অবদান ও উত্তরাধিকারের তাৎপর্য বুঝতে পারেনি, তারাই আজ আমাদের শেখাবে জাতীয়তাবাদ কী? তারাই জাতীয়তাবাদের নামে, গোরক্ষার নামে, ‘বন্দে মাতরম’-এর নামে এ দেশের সাধারণ তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে?
তিনি আরো বলেন, যারা কয়েক দশক ধরে নিজেদের পুলিশ সদর দফতরে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেনি, তারাই আজ এ দেশের তরুণদের শেখাবে—কে দেশবিরোধী, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কথা বলা যাবে আর কোন কথা বলা যাবে না?
নেহা বলেন, আরএসএসের এই ন্যাক্কারজনক ইতিহাসের দাবি হলো, পরবর্তী সময়ে যখনই তাদের কাউকে অন্য মানুষদের নানা অপবাদ ও পরিচয়ের তকমা দিতে দেখবেন, তখন এই ইতিহাসের কথাও মনে করিয়ে দেবেন।
তিনি বলেন, যখন মুসলমানদের ‘পাকিস্তানি’ বলে আখ্যায়িত করা হবে, দলিতদের ‘হিন্দুবিরোধী’ বলা হবে, কাউকে ‘আইএসআইয়ের এজেন্ট’ বলা হবে, কমিউনিস্টদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ কিংবা ‘নকশালপন্থী’ বলে চিহ্নিত করা হবে তখন তাদের বলে দেবেন, এসব অভিযোগ নিয়ে তো পরে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু তোমাদের নিজেদের ইতিহাস ঘেঁটে তোমাদের কি ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেয়া যাবে না?
নেহা বলেন, তোমরা যে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা তৈরি করেছো, সেই সংজ্ঞার মানদণ্ডে তো তোমরা নিজেরাই ব্যর্থ। তাহলে তোমরা এই দেশ পরিচালনা করবা কিভাবে?
তিনি বলেন, এই কথাগুলো শুধু আমাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মঞ্চ থেকে বললেই চলবে না; এগুলো ভারতের মানুষের মনন ও সমাজের গভীরে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষের চেতনার অংশ করে তুলতে হবে। কারণ, স্বাধীন ভারতের ভিত্তি যদি কোনো কিছুর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে তা হলো হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং সম্মিলিত সংগ্রাম।
সবশেষ নেহা বলেন, ভারতের স্বাধীনতা কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক অর্জন ছিল না। এই স্বাধীনতার পেছনে ছিল বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের ত্যাগ, রক্ত এবং সম্মিলিত লড়াই।
-ভিডিও বক্তব্য অনুবাদ করেছেন তানভীর আহমাদ
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








