দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার নিবন্ধ
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার নিবন্ধ। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় ‘চিন্তাধারা’ বিভাগে আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচের লেখা ‘নৈতিকতা ও ধর্ম’ বিষয়ক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটির অনুবাদ করেন ইফতেখার ইকবাল। নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়, ধর্ম ও নৈতিকতা পরস্পর স্বাধীন হলেও গভীরভাবে অন্যোন্যাশ্রয়ী; প্রাকৃতিক নিয়ম বা ডারউইনীয় শক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে নৈতিকতা মানবিক সহানুভূতি, বিবেক ও সৎকাজের মাধ্যমে দুর্বলকে রক্ষা করে। ঐতিহাসিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত নীতিবোধ শেষ পর্যন্ত ধর্ম ও স্রষ্টার বিশ্বাসের সাথেই যুক্ত হয়, কারণ সৎকর্ম ছাড়া বিশ্বাসের পূর্ণতা ঘটে না।

Advertisement

আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নিবন্ধটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

নৈতিকতা ও ধর্ম
আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচ

ধর্ম নৈতিকতার মূল ভিত্তি হলেও ধর্ম ও নৈতিকতা এক জিনিস নয়। নৈতিকতাতে ব্যবহার ক্ষেত্রে নৈতিকতা অধিকাংশ সময় সমাজের স্বার্থযুক্ত নয়, কিন্তু সামষ্টিকভাবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়ে যায়ে যে নিয়ন্ত্রণ শক্তি তা অন্যান্য জগতের। কাজেই একেকটিকে যেমন নৈতিকতা ও ধর্ম স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন, তেমনি একে অপরকে তাদের মধ্যে রয়েছে অনেন্যনির্ভরতা।

নৈতিকতার জন্ম হয়েছিল নিষেধজ্ঞা (Prohibition) দ্বারা এবং আজ অবধি তা নিষেধজ্ঞাটাই বয়ে গেছে। দেশ খন্ডমানের হেসেরে মুসার মাধ্যমে মোশের মানুষের প্রতি স্রষ্টার দশ আদেশ (Ten) আটটি নিষেধজ্ঞা। নৈতিকতার এই সংমুখী ও নিষেধাত্মক প্রকৃতি মানুষের মহাতারু পথ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের জন্য। খৃস্টান নীতি এখানে পরিষ্কার উদাহরণের হিসেবে গৃহীত হতে পারে।

প্রকৃতির সাথে জীবনের সামঞ্জস্য— এটা নৈতিকতার বিধান নয়, যান্ত্রিক স্টোরিক দর্শনের সেতারেই প্রচার করছেন। এটা বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধে জীবনধারণ। প্রাকৃতিক প্রবৃত্তির সীমায় সীমাবদ্ধ মানুষ যেমন মানুষ নয়, যুক্তিবুদ্ধমান পশুমান, তেমনি প্রকৃতিবদ্ধ নৈতিকতাও নৈতিকতা নয়, বরং উচ্চতমের রূপান্তরতার এক রূপ।

অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম— ডারউইনের এই তত্ত্ব নৈতিকভাবে শ্রেয় তারা দ্বারা জয়ী হতে পারে না, যার ডিউইকোর সাহায্যে তারাই এখানে জয়ী হয়। একজন ডারউইনীয় মানুষ বায়োলজিক্যাল বিশুদ্ধতার চূড়ান্ত পর্যায়ে তথা অভিমানে (Superhuman) রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু যে বিষয়টি তার পক্ষে কখনোই করাও সম্ভব হবে না। এটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই সংযোজন করতে পারেন।

বায়োলজিক্যাল প্রগতির ধারা হিসেবে কোনো সামাজিক প্রগতির নৈতিকতা বিষয়ে কোনো সামাজিক প্রগতির নৈতিকতা বিষয়ে কোনো দ্বন্দ্বই কিন্তু নেই। ইটের নীতির নৈতিকতার যে তাৎপর্য তা আর কি এমন কি উত্তর তিনি বলুন কি না। এটা এমন কি প্রগতির জন্যে ক্ষতিকর না। এটা এমন কি উত্তর তিনি বলুন কিছু না। এটা এমন কি প্রগতির জন্যে ক্ষতিকর না। এটা এমন কি উল্লেখযোগ্যে, যেকোনো যা মানুষের ঢাকাকে বাড়িয়ে তোলে তা-ই তার বিকাশ ঘটিয়ে সবচেয়ে বেশি। অবশ্য আরো স্থিতিকোণে সবচেয়ে ও শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপরীত তথাকথিত অত্যন্ত সামাজিক হয়ে নিশশ্চই করে তাদের দিকে বলবেন নীতিতে। নীতিদের নিকট খৃষ্টবাদ, বিশেষত খ্রিষ্টান নীতিভাবনা দীপ্তিময় মানুষের জীবন তৈরি করে প্রভূ জন্মমান বিন্দু। নীতিবাদ আর প্রকৃতিরণিতের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে এখানে। এক পক্ষ ধায় ধর্মকে, অপর পক্ষে সংস্কৃতি, বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে, বায়োলজিক্যাল ভাবনা থেকে আধ্যাত্মিকতাকে পৃথক করে; আরেক পক্ষ চায় ঠিক এর উল্টোটি। Fedon গ্রন্থে প্লেটো এক খাঁটি নীতিভাবনার ব্যাখ্যা দেন : অন্য সাহস এক ধরনের ক্ষার্ত কাপুরুষতা, হালকা সংযম ইন্দ্রিয়পরায়ণতারই নামান্তর, খণ্ডিত গুণপনা আসল গুণপনার ছায়ামাত্র। একজন সত্যিকারে সৎ মানুষের ওঠ্মার চালিকাশক্তি।

যদি সকল প্রগতিকে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে খোঁজা হয়, যেখানে শক্তিশালী দুর্বলকে ধ্বংস করে, তাহলে নৈতিকতা নিঃসংশয়ে বিপরীতে অবস্থান নেবে। নৈতিকতা সব সময়ই দুর্বলদের ও অপসদের রক্ষা, সহানুভূতিক ও শ্রদ্ধার দাবি জানিয়ে এসেছে। এভাবে প্রকৃতি ও নৈতিকতা প্রথম থেকে পরস্পর পরস্পরকে অবস্থান নিয়েছে। বিবেক, সহানুভূতি, ক্ষমা— এই সব মানবিক দেতোর আধিপত্য থেকে মুক্ত হও। দুর্বলকে শক্তিরতর এক রূপ।

অজ্ঞতামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক চিন্তাভাবনার একটি, যার পূর্বসৃজ সংখ্যা হলো স্বর্গ তথা সৃষ্টির ধারণা। নীতির ইতিহাসে নেই যিনি ধর্ম সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নেই— ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করার মাধ্যমে অথবা বিপরীত প্রমাণ করার চেষ্টার মাধ্যমে।

নৈতিকতামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক চিন্তাভাবনার একটি, যার পূর্বসৃজ সংখ্যা হলো স্বর্গ তথা সৃষ্টির ধারণা। নীতির ইতিহাসে নেই যিনি ধর্ম সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নেই— ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করার মাধ্যমে অথবা বিপরীত প্রমাণ করার চেষ্টার মাধ্যমে।

নিশ্চয় করে তাদের দিকে বলবেন নীতিতে। নীতিদের নিকট খৃষ্টবাদ, বিশেষত খ্রিষ্টান নীতিভাবনা দীপ্তিময় মানুষের জীবন তৈরি করে প্রভূ জন্মমান বিন্দু। নীতিবাদ আর প্রকৃতিরণিতের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে এখানে। এক পক্ষ ধায় ধর্মকে, অপর পক্ষে সংস্কৃতি, বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে, বায়োলজিক্যাল ভাবনা থেকে আধ্যাত্মিকতাকে পৃথক করে; আরেক পক্ষ চায় ঠিক এর উল্টোটি। Fedon গ্রন্থে প্লেটো এক খাঁটি নীতিভাবনার ব্যাখ্যা দেন : অন্য সাহস এক ধরনের ক্ষার্ত কাপুরুষতা, হালকা সংযম ইন্দ্রিয়পরায়ণতারই নামান্তর, খণ্ডিত গুণপনা আসল গুণপনার ছায়ামাত্র। একজন সত্যিকারে সৎ মানুষের খেয়াল খৃস্টবাদ একটি মহৎ ধর্ম ও একটি মহৎ মান্ধের সদাচার সামঞ্জস্য ও খ্রীষ্টের চমৎকার উদারূপ। খ্রিষ্টীয় যুগের ঈশ্বর সম্পূর্ণরূপে বাইবেলের কাহিনী দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার বৃত্তে শিল্পকে যুক্ত করা যেতে পারে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিকতার একটি, প্রতিনিয়ত মানসিক চিন্তাধারার অভাবই নেই, যার পূর্বসৃজ সঙ্খা হলো স্রষ্টা তরমা ধারণা। নীতির ইতিহাসে বস্তুত অথচ এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া নেই—যিনি ধর্ম সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি— ধর্মের প্রয়োজনীতাকে স্বীকার করতে করার মাধ্যমে অথবা বিপরীত প্রক্রিয়া প্রমাণ করার চেষ্টার মাধ্যমে। নীতি ও মানুষের পারস্পরিক অপরিবর্তনীয়তার প্রমাণ করে ইতিহাস বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানে প্রমাণ করতে না পারলেও এটি দুটি সুস্পষ্ট, ধর্মনিরপেক্ষ নীতিধারাই উদ্ধারে গেছেন, যেখানে নাস্তিক নীতিধারার অবর্তন এখনো সহস্র নয়। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক আন্দোলন অবর্তনভাবের ধর্মের দিকেই এগিয়েছো। সরকারি স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা। কাজে একজন সত্যিকার ধার্মিক মানুষের পক্ষে বা একজন নীতিবান মানুষের পক্ষে অধার্মিক হওয়া কল্পনা করা যায় না। ধর্ম জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা জীবনের অন্বেষণ। কিবে সে প্রশ্নের উত্তর দেয়; কিভাবে আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যবিন্দু নির্ধারণ করতে হয় এবং কিভাবে জীবনযাপন করতে হয়— ক্ষমা ও মনুষ্যত্ব দেয় যেটে নৈতিকতা। অন্যকম্ম ধর্ম হলো বিশ্বাস, নীতি হলো কর্ম। মানুষ ও দুটো জিনিসকেই একক করতে চায় না। কোরআন পক্ষপাতদের বেশি বিশ্বাস করে এবং ভালো কাজ করো— এই বলে তা একত্রিত করার প্রয়োজনতা ভুলে ধরেছে। কিন্তু লক্ষনীয় যে ভালো মানুষ হতে পারো। বলহ বলতে ভালো মানুষ হচ্ছ, তাহলেই তুমি বিশ্বাস করো। কিন্তু ভালো মানুষ হতে পারো প্রিয় জিনসাইট ধান না করা পর্যন্ত তোমার বিশ্বাস যথার্থ নয়। কিবা কিভাবে ব্যক্তি তার বিশ্বাসকে মজবুত করতে পারে তার উত্তর এই: সৎ কাজ করো, সৎ কাজের মাধ্যমে তুমি তোমার স্রষ্টাকে পাবে।

লেখক: স্বাধীন বসনিয়া-হার্জেগোভিনা প্রথম প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী
অনুবাদ: ইফতেখার ইকবাল